আফ্রিকার সমর্থন পেতে মরিয়া পুতিন, নিজস্ব স্বার্থ দেখছে নেতারা
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আফ্রিকায় রাশিয়ার প্রভাব ও আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নতুন মিত্র খুঁজতে আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগ দিয়েছে মস্কো। তবে আফ্রিকার নেতারাও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছেন নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ বিবেচনায়।
গত সপ্তাহে মস্কোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় রাশিয়া-আফ্রিকা সম্মেলনে পুতিন পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমারা দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করছে এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার মাধ্যমে মহাদেশটির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। এর বিপরীতে রাশিয়া সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সম্মেলনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৪৮টি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। এর মধ্যে ২২টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন রাষ্ট্রপ্রধানরা। ২০২৩ সালের সম্মেলনে ১৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়ার জন্য আফ্রিকার নেতাদের এই উপস্থিতি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের আফ্রিকা নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ উইল ব্রাউনের মতে, সম্মেলনে পুতিনের সঙ্গে আফ্রিকার নেতাদের ছবি এবং দৃশ্যমান উপস্থিতি মস্কোর জন্য বড় প্রচারণার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে আফ্রিকার দেশগুলো কেবল রাশিয়া কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে কাউকে বেছে নিতে চাইছে না। বরং একাধিক শক্তিশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের কৌশল অনুসরণ করছে। চ্যাথাম হাউসের আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক তিঘিসতি আমারে এই কৌশলকে ‘বৈচিত্র্যময় জোটনিরপেক্ষতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নিরাপত্তা সহযোগিতায় রাশিয়ার প্রভাব
মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের মতো দেশগুলোতে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি বেড়েছে। পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পর এসব দেশের সামরিক সরকার মস্কোর কাছ থেকে নিরাপত্তা সহযোগিতা চেয়েছে।
রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আফ্রিকা কর্পস। ২০২৩ সালে ওয়াগনার গোষ্ঠীর বিদ্রোহের পর তাদের অনেক কার্যক্রমের দায়িত্ব নেয় এই বাহিনী। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় কাজ করছে তারা।
মালি, বুরকিনা ফাসো, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, লিবিয়া, নিরক্ষীয় গিনি ও নাইজারে রাশিয়ার এই বাহিনীর উপস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। সুদানে লোহিত সাগর উপকূলে নৌঘাঁটি স্থাপনের বিষয়েও মস্কো আগ্রহ দেখাচ্ছে।
তবে রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার ফলাফল সব দেশে এক রকম নয়। মালিতে সরকারি বাহিনীকে কিদাল শহর পুনর্দখলে সহায়তা করলেও দেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রুশ বাহিনীর ভূমিকা থাকলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বাণিজ্যে চীন ও ইউরোপের চেয়ে পিছিয়ে রাশিয়া
রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়লেও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যে রাশিয়া এখনো চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
২০২৫ সালে আফ্রিকার সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২৭ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে চীন-আফ্রিকা বাণিজ্য প্রায় ৩৪৮ বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-আফ্রিকা বাণিজ্য প্রায় ৩৯৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
তবে কৃষি খাতে রাশিয়ার অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। পুতিনের দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে আফ্রিকার দেশগুলোতে ১ কোটি ৩০ লাখ টন কৃষিপণ্য রপ্তানি করেছে রাশিয়া। সার সরবরাহের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন তিনি।
জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। মিসরে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের উদ্যোগে এল দাবা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ওষুধ, টিকা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো।
অস্ত্র বিক্রিতেও আগ্রহ রাশিয়ার
আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদারে অস্ত্র সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সম্মেলনে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ জানান, তাঁর দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান পেয়েছে এবং এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার চারটি ইউনিট সংগ্রহ করবে।
চুক্তির আওতায় মোট ১২টি যুদ্ধবিমান সরবরাহের কথা রয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে দুটি যুদ্ধবিমান সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি আফ্রিকার নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে প্রতারণা, জবরদস্তি ও আর্থিক সংকটের সুযোগ নিয়ে আফ্রিকান নাগরিকদের রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এসব ঘটনার কিছু ক্ষেত্রে মানবপাচারের উপাদান রয়েছে।
রাশিয়া অবশ্য অবৈধভাবে আফ্রিকান নাগরিক নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সম্মেলনে নতুন চুক্তি, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
সম্মেলনে রাশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণা, বেসামরিক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে চুক্তি এবং ২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সহযোগিতার কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের সঙ্গেও নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার পরিকল্পনা স্বাক্ষর করেছে রাশিয়া।
তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, দায়িত্ব বণ্টন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন আফ্রিকার দেশগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা পেতে চাইছেন। অন্যদিকে আফ্রিকার নেতারা রাশিয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা দেশ ও চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও আফ্রিকার দেশগুলো কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে আগ্রহী নয়।



