ভারত থেকে আমদানি করা চালে ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান 'আফলাটক্সিন'-এর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর এর বিতরণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের নমুনা পরীক্ষায় এই বিপজ্জনক উপাদান পাওয়ার পর জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়াতে অবশিষ্ট ৯ হাজার ৫০০ টন চাল অধিকতর পরীক্ষার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পটভূমি ও আমদানি প্রক্রিয়া: আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার মূল্যে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তির অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল' চাল সরবরাহ করে। গত ২১ জুলাই প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন চাল নিয়ে 'এমভি এইচটি পাইওনিয়ার' জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পাঠানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় চালগুলো খাওয়ার উপযোগী বলে বিবেচিত হওয়ায় ২৪ ও ২৫ জুলাই খালাসের অনুমতি দেওয়া হয় এবং চালগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের সরকারি গুদামে পাঠানো হয়।
মানের অবনতি ও বিতর্ক: গুদামে পৌঁছানোর পর চালের একটি অংশের মান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা। কেউ কেউ চালের মান অত্যন্ত নিম্ন এবং খাওয়ার প্রায় অনুপযোগী বলে উল্লেখ করেন। এর প্রেক্ষিতে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল নিম্নমানের অভিযোগে জাহাজে ফেরত পাঠানো হয় এবং বাকি ৯ হাজার ৫শ টন চাল গ্রহণ করা হয়। পরে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান পুনরায় মান পরীক্ষার নির্দেশ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান জানান, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা হলে চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। যদিও পরীক্ষায় প্রাপ্ত মাত্রা বর্তমানে সহনীয় সীমার মধ্যে রয়েছে, তবে তা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়া ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য: চালে আফলাটক্সিন পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। তাদের দাবি, বাংলাদেশ ও সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগৃহীত নমুনা ভারতের একটি ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং সেখানে চাল চুক্তির নির্ধারিত মান পূরণ করেছে বলে জানানো হয়েছিল। ব্রির সিলগালা করা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলেও তাদের জানানো হয়েছে। এছাড়া সরবরাহকারীর শিপিং এজেন্ট 'সেভেন সিজ শিপিং লাইনে'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করেছেন যে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের ফলে পুরো প্রক্রিয়া এবং প্রাথমিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নমুনায় শনাক্ত হওয়া আফলাটক্সিনের সুনির্দিষ্ট মাত্রা বা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।



