রাশিয়ার চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীদের জন্য তৈরি অর্থপাচার ও আর্থিক নজরদারি সংক্রান্ত সরকারি ‘ব্ল্যাকলিস্টে’ যুক্ত করা হয়েছে মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পাভেল দুলেভকে। রাশিয়ার অর্থ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা 'রসফিনমনিটরিং' বৃহস্পতিবার তাদের অনলাইন খাতায় দুলেভের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। কয়েক দিন আগেই রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা অভিযোগ করেছিল—ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের কার্যকলাপ চালাতে দুলেভ নিজের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
রুশ সরকারের এই তালিকার কারণে এখন থেকে রাশিয়ায় পাভেল দুলেভের যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে।
আন্তর্জাতিক তল্লাশি ও রাশিয়ার অভিযোগ
রাশিয়ান সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) চলতি সপ্তাহেই ৪১ বছর বয়সী এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তাকে বিশ্বজুড়ে খোঁজার জন্য একটি আন্তর্জাতিক তল্লাশি কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেয়। যদিও অন্যান্য দেশ কিংবা আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রাশিয়ার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে দুলেভকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এফএসবি দাবি করেছে, টেলিগ্রামে চালু থাকা একটি বহুল ব্যবহৃত ডেটিং বট সরাতে ব্যর্থ হয়েছেন দুলেভ। মস্কোর অভিযোগ—এই বটটি ব্যবহার করে ইউক্রেনীয় স্পেশাল সার্ভিস তরুণ রুশদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নাশকতামূলক কাজে জড়িয়ে ফেলছিল। তবে রুশ সরকারের এসব কঠোর অভিযোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত দুলেভ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ ও টেলিগ্রামের সঙ্গে দ্বন্দ্ব
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে জন্মগ্রহণকারী পাভেল দুলেভকে একসময় ‘রাশিয়ান ফেসবুকে’র প্রতিষ্ঠাতা বলা হতো, যা বর্তমানে 'ভিকে' (VKontakte) নামে পরিচিত। রুশ প্রশাসন প্ল্যাটফর্মটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালালে দুলেভের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং তিনি ভিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তিনি এনক্রিপ্টেড মেসেজিং সার্ভিস টেলিগ্রাম উদ্ভাবন করেন এবং রাশিয়ার বাইরে চলে যান। বর্তমানে তিনি ফ্রান্স ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশের মাটিতে বসবাস করছেন।
রাশিয়ার নাগরিকরা তথ্য আদান-প্রদানে ব্যাপকভাবে টেলিগ্রামের ওপর নির্ভরশীল। বহু বছর ধরেই মস্কো ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করতে বারবার টেলিগ্রামের গতি রোধ বা বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। দুলেভ যাতে ব্যবহারকারীদের গোপনীয় ডেটা বা তথ্য রুশ প্রশাসনের হাতে তুলে দেন অথবা দেশটির সাধারণ মানুষকে টেলিগ্রামের বদলে সরকারি নজরদারিতে থাকা কোনো মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারে বাধ্য করা যায়—সেজন্যই বারবার তাঁর ওপর এমন চাপ দেওয়া হয়েছে। অতি সম্প্রতি রাশিয়া 'ম্যাক্স' নামে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত একটি উন্মুক্ত অ্যাপ ব্যবহারে দেশের জনগণকে বাধ্য করার নীতি গ্রহণ করেছে, যাকে দুলেভ শুরু থেকেই 'রাজনৈতিক সেন্সরশিপ ও ব্যাপক নজরদারির হাতিয়ার' হিসেবে সমালোচনা করে আসছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনি জটিলতা
রাশিয়া ছাড়াও ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছেও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছিলেন টেলিগ্রাম সিইও দুলেভ। অবৈধ কনটেন্ট ছড়ানোর দায়ে ২০২৪ সালে প্যারিসের পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল, তবে পরবর্তী সময়ে তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তীতে তাঁর ওপর থাকা ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা ফরাসি আদালত প্রত্যাহার করে নিলে তিনি দেশটি ত্যাগ করেন।
মস্কো সাধারণত দেশ ও বিদেশের মাটিতে থাকা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বিরোধীদের দাবিয়ে রাখতে হরহামেশাই ‘সন্ত্রাসবাদ’ কিংবা ‘উগ্রবাদের’ অভিযোগ এনে আইনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। দুলেভকে নতুন করে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সেই পুরনো কৌশলেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

