ঢাকা

স্কুলে মিড ডে মিলে পচা খাবারের অভিযোগ, নীতিমালা পরিবর্তনের আলোচনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হওয়া ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পুষ্টি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও বিভিন্ন এলাকায় খাবারের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোথাও পচা বা কাঁচা কলা, নিম্নমানের বানরুটি, আবার কোথাও নষ্ট সেদ্ধ ডিম বিতরণের ঘটনা সামনে এসেছে। এসব অনিয়মের প্রেক্ষাপটে কর্মসূচির খাবারের ধরন পরিবর্তনের বিষয়েও ভাবছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কোথাও সন্তোষ, কোথাও উদ্বেগ

নরসিংদী শহরের বৌয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ৩৩৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে সেদিন উপস্থিত ২৪০ জনকে একটি করে সেদ্ধ ডিম ও দুই পিস বানরুটি দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, তারা নিয়মিত খাবার পাচ্ছে এবং মান নিয়েও তেমন অভিযোগ নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অপর্ণা রানী দেবী বলেন, অন্যত্র সমস্যা থাকলেও তাদের বিদ্যালয়ে এখনো মানের অবনতি ঘটেনি।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভিন্ন ঘটনা ঘটে। গত ২২ এপ্রিল ফিডিং কর্মসূচির বানরুটি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে।

একইভাবে ফরিদপুর সদর উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাঁচা কলা বিতরণের ঘটনায় এক সহকারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

কর্মসূচির বিস্তৃতি ও লক্ষ্য

পুষ্টিহীনতা ও ক্ষুধা প্রাথমিক শিক্ষার বড় বাধা বিবেচনায় রেখে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করা হয়। বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাচ্ছে।

এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য—

শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বৃদ্ধি
ঝরে পড়া কমানো
শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা

খাবারের তালিকায় রয়েছে বানরুটি, সেদ্ধ ডিম, কলা, ইউএইচটি দুধ এবং ফর্টিফায়েড বিস্কুট।

অভিযোগের ধরন ও কারণ

খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ প্রধানত সরবরাহ ও বিতরণ পর্যায়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে খাবার সংগ্রহ ও সরবরাহে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—

কম দামে নিম্নমানের পণ্য সংগ্রহ
আগে থেকে ডিম সেদ্ধ করে রাখা
কাঁচা বা পচা কলা সরবরাহ
পরিবহনে ত্রুটি

চট্টগ্রাম-এর আনোয়ারা উপজেলায় গত মার্চে বিভিন্ন স্কুলে পচা ও কাঁচা কলা সরবরাহের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

এ ছাড়া মাদারীপুর সদর উপজেলায় খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; অন্তত ১৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

সরকারি প্রতিক্রিয়া ও তদারকি জোরদার

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফিডিং কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ পেলেই সরবরাহকারীদের শোকজ করা হচ্ছে এবং বিদ্যালয়গুলোকে নিম্নমানের খাবার ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদারকি বাড়াতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

খাবারের তালিকা ও ব্যয়

বর্তমানে সপ্তাহে ছয় দিন খাবার দেওয়া হয়। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী—

শনি, রবি, বুধ, বৃহস্পতিবার: বানরুটি ও সেদ্ধ ডিম
সোমবার: বানরুটি ও ইউএইচটি দুধ
মঙ্গলবার: ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও কলা

বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি আইটেমের আনুমানিক খরচ—
ডিম ১৪ টাকা, কলা ১০ টাকা, বানরুটি ২৫ টাকা, দুধ ২৯ টাকা এবং বিস্কুট ১৯ টাকা।

‘সিঙ্গেল আইটেম’ বিতরণে অসন্তোষ

মৌলভীবাজার-এর শ্রীমঙ্গলে কিছু বিদ্যালয়ে নির্ধারিত তালিকার পরিবর্তে একক আইটেম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীরা বলছে, শুধু বানরুটি দিলে তা খেতে কষ্ট হয়।

অন্যদিকে দিনাজপুর-এর একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, মিড-ডে মিল চালুর ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞ মত

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, এই কর্মসূচি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল উন্নত করতে সহায়ক। তবে খাবারের মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা যাবে না। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে তদারকিতে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন।

সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

বর্তমানে ১৫০ উপজেলায় চালু থাকা এই কর্মসূচি আগামীতে আরও ৩৪৮ উপজেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিন বছরের জন্য মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, যা সম্প্রসারণের পর প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।



‘মিড-ডে মিল’ নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও তদারকির ঘাটতি এই উদ্যোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মান নিশ্চিত করতে না পারলে কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—পরিকল্পনার বিস্তার নয়, বরং বাস্তবায়নের মান নিশ্চিত করা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স