ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নবনির্বাচিত ৪৯ জন সদস্য শপথ গ্রহণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে “ট্রফি নেত্রী” শব্দবন্ধ ব্যবহার করে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। ওই ভিডিওতে জামায়াত–সমর্থিত নারী প্রতিনিধি মারদিয়া মমতাজ–কে সংসদ ভবনে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়, “সংরক্ষিত নারী আসনের শপথ নিতে সংসদে জামায়াতের ট্রফি নেত্রী মারদিয়া মমতাজ।” এরপর থেকেই বিষয়টি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিও ছড়ানো ও অনলাইন প্রতিক্রিয়া
শপথ অনুষ্ঠানের দিন সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত সদস্যদের প্রবেশের ভিডিওটি একাধিক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে পোস্ট করা হয়। একটি পোস্ট প্রায় ৭০ হাজারবার দেখা হয় এবং সেখানে হাজারো প্রতিক্রিয়া পড়ে।
একই ধরনের ক্যাপশন ব্যবহার করে আরও পোস্ট ছড়ায়, যেখানে ব্যবহারকারীরা “ট্রফি” শব্দটি ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যবহার করেন। কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, মারদিয়া মমতাজ নাকি আগে অন্য নারীদের নিয়ে “ট্রফি” মন্তব্য করেছিলেন—যদিও সেই দাবির পক্ষে প্রাথমিকভাবে কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি।
একই ভিডিও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একাধিক অ্যাকাউন্ট, যেমন ‘Next Bangladesh Network’ নামের পেজ থেকেও শেয়ার করা হয়। এতে পোস্টটি আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
‘ট্রফি’ শব্দের মূল উৎস কী?
অনুসন্ধানে দেখা যায়, “ট্রফি” শব্দটি প্রথমবার ব্যবহার করেন স্বয়ং মারদিয়া মমতাজ নিজেই, একটি টেলিভিশন টকশোতে আলোচনার সময়।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বেসরকারি টেলিভিশন জিটিভি–এর ইউটিউব চ্যানেলে “সহজ রাজনীতি–টাইমলাইন বাংলাদেশ” শীর্ষক একটি আলোচনামূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে ছিলেন মারদিয়া মমতাজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহরিন আই খান এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক তুহিন খান।
বিতর্কিত অংশ: কী বলেছিলেন মারদিয়া মমতাজ
আলোচনার এক পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নারী প্রার্থী মনোনয়ন ও অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে। তখন মারদিয়া মমতাজ বলেন, সমাজে নারীদের নেতৃত্ব গ্রহণে ধীর পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি “ট্রফি প্রার্থী” শব্দটি ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, দলগুলো চাইলে “ট্রফি” হিসেবে কিছু নারী প্রার্থী বসাতে পারত, কিন্তু তারা তা না করে সময় নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই বক্তব্যের সময়ই “ট্রফি” শব্দটি আলোচনায় আসে এবং সেটিকে ঘিরেই পরবর্তী সময়ে ব্যাখ্যা ও বিতর্ক তৈরি হয়।
শব্দ নিয়ে আপত্তি ও ব্যাখ্যা
অনুষ্ঠানে সহ–আলোচক নাহরিন আই খান “ট্রফি” শব্দ ব্যবহারের প্রতি আপত্তি জানিয়ে বলেন, এটি নারীদের জন্য অবমাননাকর ধারণা তৈরি করতে পারে।
পরে মারদিয়া মমতাজ বলেন, তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি কোনো নারী নেতৃত্বকে অবমূল্যায়ন করতে চাননি। তিনি আরও জানান, শব্দটি তিনি “সচেতনভাবেই” ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে।
ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণ
অনুসন্ধান অনুযায়ী দেখা যায়—
“ট্রফি নেত্রী” শব্দটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ক্যাপশনের অংশ
মূল ভিডিও বা কোনো নির্ভরযোগ্য বক্তব্যে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি
বরং “ট্রফি” শব্দটি মূলত একটি টকশো আলোচনার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল
পরবর্তীতে সেটিকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রচার করা হয়
ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভাইরাল ভিডিওর ক্যাপশনে ব্যবহৃত “ট্রফি নেত্রী” শব্দটি বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। মূল আলোচনায় এমন কোনো রাজনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক পরিচয় হিসেবে শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি।
বরং একটি টেলিভিশন আলোচনার অংশ থেকে “ট্রফি” শব্দটি আলাদা করে সামাজিক মাধ্যমে পুনঃপ্রচার ও প্রেক্ষাপটবিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করাই এই বিভ্রান্তির মূল কারণ।