যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ (Duration of Status) ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিসা চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে হোয়াইট হাউস। নতুন এই নিয়ম কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, এক্সচেঞ্জ ভিজিটর এবং বিদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার নিয়ম আরও নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত হবে।
প্রস্তাবিত এই বিধিমালা যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (DHS) পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের অনুমোদনের পর এটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদন ও কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে নতুন নিয়ম কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ভিসা ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থায় পরিবর্তন
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এফ-১ (F-1) ভিসাধারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা তাঁদের নির্ধারিত শিক্ষাক্রমে নিয়ম মেনে ভর্তি থাকা অবস্থায় সাধারণত পুরো কোর্স শেষ হওয়া পর্যন্ত দেশটিতে থাকতে পারেন। অর্থাৎ ভিসায় আলাদা করে নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ না থাকলেও শিক্ষার্থীর বৈধ থাকার অনুমতি তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
নতুন নিয়ম কার্যকর হলে এই সুবিধায় পরিবর্তন আসবে। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বৈধ থাকার অনুমতি নির্ধারণ করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকাংশ এফ-১ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি পাবেন।
এই সময়ের মধ্যে পড়াশোনা শেষ না হলে তাঁদের অতিরিক্ত সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া নির্ধারিত সময়ের বেশি থাকা সম্ভব হবে না।
দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাক্রমে বাড়বে জটিলতা
নতুন নিয়ম সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে গবেষণাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাক্রমে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর। অনেক মাস্টার্স, গবেষণা ও পিএইচডি প্রোগ্রাম চার বছরের বেশি সময় নিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময়ের অনুমতি নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। গবেষণার কাজ, থিসিস সম্পন্ন করা বা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে বাড়তি প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রোগ্রাম পরিবর্তনের নিয়মেও আসছে কড়াকড়ি
প্রস্তাবিত নীতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের বিষয়েও নতুন বিধিনিষেধ আনার কথা বলা হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী একটি শিক্ষাস্তর সম্পন্ন করার পর সাধারণত উচ্চতর স্তরের প্রোগ্রামে যেতে পারবেন।
অর্থাৎ স্নাতক শেষ করার পর স্নাতকোত্তরে যাওয়া বা স্নাতকোত্তরের পর পিএইচডিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা থাকবে না। তবে একই স্তরের বা নিচের স্তরের অন্য কোনো প্রোগ্রামে পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার প্রস্তুতির সময় কমছে
বর্তমানে পড়াশোনা বা অনুমোদিত প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার প্রস্তুতির জন্য ৬০ দিনের সময় পান। নতুন প্রস্তাবে এই সময় কমিয়ে ৩০ দিন করার কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, চাকরির সুযোগ খোঁজা কিংবা পরবর্তী শিক্ষার প্রস্তুতির জন্য সময় কমে আসবে।
ভারতসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা বেশি প্রভাবিত হতে পারেন
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় গন্তব্য। প্রতিবছর ভারত, চীন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দেশটিতে উচ্চশিক্ষার জন্য যান।
বিশেষ করে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় সংখ্যায় ভর্তি হন, নতুন নিয়মের কারণে বেশি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতে, নির্দিষ্ট সময় পরপর ভিসা নবায়নের বাধ্যবাধকতা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও নতুন নিয়ম মেনে আরও বেশি কাগজপত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
নতুন নীতির সমালোচকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার অন্যতম আকর্ষণ ছিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকার সুযোগ। নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিসা চালু হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, গবেষণা ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়তে পারেন। কারণ এসব ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব একাডেমিক কাজ শেষ করা সব সময় সম্ভব হয় না।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিসা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থান আরও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এখনই কার্যকর হচ্ছে না নতুন নিয়ম
যদিও হোয়াইট হাউস নতুন বিধিমালার অনুমোদন দিয়েছে, এটি এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। আনুষ্ঠানিক প্রকাশ, জনমত গ্রহণ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
তাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত বা নতুন করে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এখনো আগের নিয়মই প্রযোজ্য। নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিবর্তনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে নতুন এই ভিসা নীতি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের থাকার প্রক্রিয়ায় এটি গত কয়েক দশকের অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।