তরুণ নেতৃত্ব বিকাশ, শিক্ষার্থীদের সামাজিক উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘গেট এনগেজড’ সম্মেলনের ১৩তম আসর। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের ১২টি দেশের ৪৩ জন কো-অর্ডিনেটর অংশ নেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয় ‘জিএইচইএ২১ গেট এনগেজড কনফারেন্স ২০২৬: স্টুডেন্ট অ্যাকশন অ্যান্ড ইয়ুথ লিডারশিপ’ শিরোনামে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন এবং বার্ড কলেজের সেন্টার ফর সিভিক এনগেজমেন্ট যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
এর আগে ২০২৫ সালে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে অবস্থিত ইউরোপিয়ান হিউম্যানিটিজ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। এবারই প্রথম বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো বৈশ্বিক এই তরুণ নেতৃত্ব সম্মেলন।
তরুণদের সামাজিক উদ্যোগ ও নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্ব
সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের তরুণ নেতা, সিভিক এনগেজমেন্ট কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক ও পেশাজীবীরা অংশ নেন। তাঁরা নিজেদের কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন এবং সামাজিক পরিবর্তনে তরুণদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে নেতৃত্ব বিকাশ, যোগাযোগ দক্ষতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক তৈরি এবং টেকসই সামাজিক সম্পৃক্ততার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আয়োজকদের মতে, বর্তমান বিশ্বের জটিল সমস্যা মোকাবিলায় শুধু একাডেমিক জ্ঞান নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, সামাজিক সচেতনতা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা। এ লক্ষ্যেই তরুণদের মধ্যে এসব দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর সম্মেলনে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈশ্বিক নাগরিক তৈরির ওপর গুরুত্ব
‘জিএইচইএ২১’ বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। এর লক্ষ্য হলো লিবারেল আর্টস ও বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা এবং শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন তামারা হাসান আবেদ।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব যেসব জটিল সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো মোকাবিলায় এমন বৈশ্বিক নাগরিক প্রয়োজন, যাঁরা সমাজের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে কাজ করতে আগ্রহী।
তামারা হাসান আবেদ বলেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে সমাজের জন্য কাজ করার ধারণা পাঠক্রমের বাইরের কোনো বিষয় নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের অংশ। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে তাঁরা নেতৃত্বকে শুধু একটি পদ বা দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি চর্চা হিসেবে দেখতে পারেন।
তিনি বলেন, মানুষের কথা শোনা, তাদের প্রয়োজন বোঝা এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখাই প্রকৃত নেতৃত্বের অংশ।
প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক জ্ঞানের সমন্বয়ের আহ্বান
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বলেন, শুধু প্রযুক্তি ও বিদ্যমান তথ্যের ওপর নির্ভর করে অর্থবহ উদ্ভাবন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের (এসটিইএম) পাশাপাশি সমাজ, লিবারেল আর্টস এবং মানবিক প্রযুক্তির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
তাঁর মতে, ভবিষ্যতের উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব তৈরিতে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানুষের আচরণ, সমাজ ও সংস্কৃতি বোঝার সক্ষমতাও জরুরি।
উচ্চশিক্ষায় সিভিক এনগেজমেন্টের গুরুত্ব
বার্ড কলেজের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও একাডেমিক অ্যাফেয়ার্স-বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোনাথন অ্যাডাম বেকার উচ্চশিক্ষায় সিভিক এনগেজমেন্টের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বার্ড কলেজের সেন্টার ফর সিভিক এনগেজমেন্টের পরিচালক এবং জিএইচইএ২১-এর ভাইস চ্যান্সেলর। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
বৈশ্বিক সহযোগিতার মডেল অনুসরণের আহ্বান
সম্মেলনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি যে নেতৃত্ব দিচ্ছে, দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং তরুণ নেতৃত্ব বিকাশে নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দৃষ্টিভঙ্গি
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের ডিন এবং জিএইচইএ২১-এর ফ্যাকাল্টি সদস্য প্রফেসর সামিয়া হক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অন্যতম শক্তিশালী উপায়।
অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও সমাপনী আয়োজন
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর অমৃতা মাকিন ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড, মিলেনিয়াম ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক কাউন্সিলের কো-চেয়ার ড. সু এল ম্যাক্সাম এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সিভিক এনগেজমেন্ট-বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর নাবিল বি আরিফ।
সমাপনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এবং জিএইচইএ২১-এর ফ্যাকাল্টি সদস্য ফাহমিদা রহমান।
সম্মেলনের মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন চিন্তা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে আয়োজকেরা জানান।