ঢাকা

‘ল্যাপটপগুলি ভাগাভাগি করে নিলেন’—বিএনপি নেতার পোস্ট ঘিরে আলোচনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে বিনা মূল্যে ল্যাপটপ বিতরণ এবং সার ডিলারশিপ বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফয়সাল আলিম। দলীয় নেতা-কর্মীদের বঞ্চিত করে আত্মীয়স্বজনকে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। তাঁর এই পোস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

জয়পুরহাটের বিভিন্ন প্রকল্পে কথিত অনিয়ম এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে পোস্ট দেন ফয়সাল আলিম। সেখানে তিনি লেখেন, ‘ল্যাপটপগুলি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে খেয়ে ফেললেন।’ গত ছয় মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ করে ‘খাওয়া’ শেষ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্পে কথিত ভাগ-বাঁটোয়ারার অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে পোস্টে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো নথি, প্রকল্পের নাম কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় উল্লেখ করেননি তিনি।

ল্যাপটপ বিতরণের পাশাপাশি সার ডিলারশিপ বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই বিএনপি নেতা। তাঁর অভিযোগ, ডিলারশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের কেউ সুযোগ পাননি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনের নামে ডিলারশিপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

পোস্টের শেষে ফয়সাল আলিম লেখেন, ‘আমি তো অবাক নয়নে দেখে যাচ্ছি আমাদের জয়পুরহাটের কী হবে?’ তাঁর এই মন্তব্যের পর পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে কথা বলেছেন, আবার কেউ তাঁর সমালোচনা করেছেন। কয়েকজন মন্তব্যকারী স্থানীয় রাজনীতি, দলীয় নেতৃত্ব এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই নিয়েও নতুন অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব মন্তব্যের অনেকগুলোর পক্ষেই কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
ল্যাপটপ বিতরণ ও সার ডিলারশিপ নিয়ে প্রশ্ন
জয়পুরহাট জেলা পরিষদ থেকে সম্প্রতি জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে বিনা মূল্যে ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়। এই বিতরণপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ফয়সাল আলিম। তাঁর বক্তব্য, ল্যাপটপগুলো যথাযথভাবে বিতরণ না করে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পে নির্দিষ্ট হারে অর্থ নেওয়া বা ভাগ-বাঁটোয়ারার অভিযোগও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় তুলে ধরেছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথম আলোকে মুঠোফোনে ফয়সাল আলিম বলেন, ‘কারা ল্যাপটপ ভাগাভাগি করল, সেটি জয়পুরহাটবাসী জানে। আবার বিভিন্ন প্রকল্পের পারসেন্টেজের বিষয়টিও জানে। সত্যি কথা বলতে হবে।’

সার ডিলারশিপ বণ্টন নিয়ে নিজের অভিযোগের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সারের ডিলার কারা পেয়েছেন, সেটিও প্রকাশ হয়েছে। কেউ শাশুড়ির নামে, কেউ শ্যালকের নামে নিয়েছেন। দলে কি নেতা-কর্মীর অভাব ছিল? তাঁরা পেলেন না কেন?’

ফয়সাল আলিমের বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় উঠে এসেছে—জুলাইযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ করা ল্যাপটপ বিতরণে কথিত অনিয়ম এবং সার ডিলারশিপ বণ্টনে দলীয় নেতা-কর্মীদের বঞ্চিত করে আত্মীয়স্বজনকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। তবে কারা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, কোন প্রকল্পে কত শতাংশ অর্থ নেওয়া হয়েছে কিংবা কোন কোন ব্যক্তি আত্মীয়ের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন—এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দেননি। ফলে তাঁর অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য সামনে আসেনি।
‘দলের বিরুদ্ধে নয়, দলের পক্ষে কথা বলেছি’
ফেসবুক পোস্টের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফয়সাল আলিম দাবি করেন, তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য বিএনপিকে বিব্রত করা নয়; বরং দলের স্বার্থ রক্ষা করা। তাঁর মতে, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা দলের জন্যই প্রয়োজন।

তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি স্ট্যাটাস দিয়ে দলের বিরুদ্ধে নয়, দলের পক্ষে কথা বলেছি। কারণ, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোনো অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন না।’

ফয়সাল আলিমের এই বক্তব্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রসঙ্গ এসেছে। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা প্রকাশ্যে আনা দলের ভাবমূর্তি রক্ষারই অংশ। তবে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য ছাড়া সেগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
পোস্টের মন্তব্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ফয়সাল আলিমের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে তাঁর অভিযোগ নিয়ে সমর্থন ও সমালোচনা—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখা গেছে। কেউ তাঁর বক্তব্যের সূত্র ধরে স্থানীয় পর্যায়ে আরও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন, আবার কেউ তাঁর মতো একজন কেন্দ্রীয় নেতার ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।

তারিক হোসেন খান নামে একজন মন্তব্যকারী লেখেন, ‘আরও খাওয়া আছে তো। এখন মেম্বার-চেয়ারম্যান বিক্রি হচ্ছে, ওরা বলছে আসো, সবাই আসো, টাকা দাও, টিকিট নাও।’

এই মন্তব্যে স্থানীয় নির্বাচনে সদস্য ও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাই কিংবা মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের ইঙ্গিত রয়েছে। তবে মন্তব্যকারী এ দাবির পক্ষে কোনো নথি, নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ বা প্রমাণ দেননি। ফলে এটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।

অন্যদিকে, বেলাল হোসেন নামে এক মন্তব্যকারী ফয়সাল আলিমের সমালোচনা করে বলেন, কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তাঁর নিজের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও আলোচনায় আসা উচিত। তিনি লেখেন, ‘এ পর্যন্ত যা দেখছি, তা হলো কিছু সস্তা পোস্ট আর কিছু লোক দেখানো ছবি।’

বেলাল হোসেনের মতে, এ ধরনের পোস্ট দলের ভেতরে বিতর্ক, বিভক্তি ও কোন্দল বাড়াতে পারে। তাঁর মন্তব্যে দলীয় নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের ধরন এবং এসব বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে অসন্তোষের প্রতিফলন দেখা যায়।

জিল্লুর রহমান নামে আরেক মন্তব্যকারী ফয়সাল আলিমের পোস্টকে জামায়াতের প্রচারের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য, বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে এভাবে প্রকাশ্যে লিখলে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। এ ছাড়া ফয়সাল আলিমের বক্তব্য ও ‘হিংসার’ কারণে বিএনপির প্রার্থী মাসুদ রানা প্রধান পরাজিত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এ দাবির পক্ষেও কোনো তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি ওই মন্তব্যকারী।

এসব প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, ফয়সাল আলিমের পোস্টকে কেন্দ্র করে শুধু ল্যাপটপ বিতরণ ও সার ডিলারশিপের অভিযোগই নয়, দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্যগুলো সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না।
ফয়সাল আলিমের রাজনৈতিক পারিবারিক পরিচয়
ফয়সাল আলিম বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাঁর বাবা আব্দুল আলিম ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে জয়পুরহাট-১ (সদর ও পাঁচবিবি) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তবে আব্দুল আলিমের রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাও তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ওই মামলায় তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০১৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

এই পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমির মধ্যে ফয়সাল আলিমের বর্তমান বক্তব্য জয়পুরহাটের স্থানীয় রাজনীতি এবং বিএনপির সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে দলীয় নেতা-কর্মীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ এবং আত্মীয়স্বজনকে সুবিধা দেওয়ার দাবি স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়কের প্রতিক্রিয়া
ফয়সাল আলিমের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জয়পুরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলজার হোসেনও। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি ফয়সাল আলিম সাহেবের ফেসবুকের স্ট্যাটাস দেখেছি। আমার স্ট্যাটাস পড়তে রুচিতে বেঁধেছে। অথচ কেউ স্ট্যাটাস দিল, তাঁর কিছুই মনে হয়নি।’

গোলজার হোসেনের এই মন্তব্য থেকে পোস্টটির ভাষা ও উপস্থাপন নিয়ে তাঁর অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে ল্যাপটপ বিতরণ, সার ডিলারশিপ বণ্টন কিংবা প্রকল্পে কথিত অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠতে পারে
জয়পুরহাটে জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে বিনা মূল্যে ল্যাপটপ বিতরণ এবং সার ডিলারশিপ বণ্টন নিয়ে ফয়সাল আলিমের অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বণ্টনে যোগ্য ব্যক্তিরা সুযোগ পেয়েছেন কি না, দলীয় পরিচয় কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক কোনো ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

তবে এখন পর্যন্ত ফয়সাল আলিমের ফেসবুক পোস্ট, তাঁর বক্তব্য এবং মন্তব্যকারীদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রয়েছে। অভিযোগগুলোর পক্ষে বিস্তারিত নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সামনে আসেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিরা এবং ল্যাপটপ বিতরণ বা সার ডিলারশিপ বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে, ফয়সাল আলিমের পোস্ট জয়পুরহাটের স্থানীয় রাজনীতিতে অনিয়মের অভিযোগ এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে প্রকাশ্যে এনেছে। অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বদলে নথি, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স