দেশের বহুল আলোচিত তিনটি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক। মামলাগুলো হলো নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা।
আদালতের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার আপিল শুনানি শুরু হবে ১৭ নভেম্বর। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ২৪ নভেম্বর। আর মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার আপিল শুনানি হবে ১ ডিসেম্বর।
রোববার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এসব মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তিনটি মামলাতেই বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আপিল অথবা আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন।
দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ রাষ্ট্রপক্ষের
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আলোচিত তিনটি হত্যা মামলার আপিল শুনানির জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আদালত তিন মামলার শুনানির জন্য পৃথক তারিখ নির্ধারণ করেছেন। নির্ধারিত দিনগুলোতে যেন শুনানি শুরু করা যায়, সেটিই রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন: ঘটনার এক যুগ পরও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। একই সময় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালককেও তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের হত্যা করে মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
নিহত সাতজন হলেন নজরুল ইসলাম, তাঁর সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম ও লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম।
এ ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আরও নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। বাকি ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যান্য মেয়াদে কারাদণ্ড পাওয়া নয়জনের সাজাও বহাল থাকে।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ২০১৯ সালে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন, এম মাসুদ রানাসহ দণ্ডিত ব্যক্তিরা আপিল করেন। সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনও এ মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের আপিলের শুনানির জন্য এবার ১৭ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।
আবরার ফাহাদ হত্যা: আপিল শুনানি ২৪ নভেম্বর
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। পরদিন সকালে হল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে উঠে আসে।
আবরার কুষ্টিয়ার বাসিন্দা ছিলেন এবং বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। আদালত ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রেখে রায় দেন। এরপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল করেন এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন বলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
এসব আবেদনের শুনানি আগামী ২৪ নভেম্বর শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
মেজর সিনহা হত্যা: শুনানির তারিখ ১ ডিসেম্বর
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর পুলিশ তল্লাশিচৌকিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। ওই সময় বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে তিনি নিহত হন।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় দেন। রায়ে টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অপর ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ২ জুন দেওয়া রায়ে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। এরপর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে প্রদীপ কুমার দাশসহ আসামিরা আপিল করেন।
এই মামলার আপিল শুনানির জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
তিনটি মামলাই দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে আলোচিত। নির্ধারিত তারিখে শুনানি শুরু হলে এসব মামলায় উচ্চ আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও সাধারণ মানুষের।