ঢাকা

কানাডার সামরিক ঘাঁটিতে আগুনে ৪৩ জন হতাহত, নাশকতার আশঙ্কা নাকচ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

কানাডার আলবার্টা প্রদেশের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চার সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩৯ জন। তাঁদের মধ্যে ১৯ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে প্রাদেশিক সরকার। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনার পেছনে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বা নাশকতার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার স্থানীয় সময় বিকেল চারটার দিকে কানাডার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র ‘কানাডিয়ান ফোর্সেস বেস ওয়েনরাইটে’ আগুনের সূত্রপাত হয়। শুকনো ঘাসে লাগা আগুন অস্বাভাবিক তীব্র বাতাসের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আগুনের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ঘাঁটির প্রশিক্ষণ এলাকার প্রশাসনিক অংশের দিকে চলে আসে।

অগ্নিকাণ্ডের পর সামরিক বাহিনী ও জরুরি সেবাদানকারী দলগুলো আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা রাত ধরে কাজ করে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও উদ্ধারকাজ ও আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর কার্যক্রম চালানো হয়। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সসহ একাধিক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হয়েছে।

রোববার রাজধানী অটোয়া থেকে দেওয়া এক ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ ঘটনাকে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে, আলবার্টার প্রাদেশিক সরকারের প্রধান ড্যানিয়েল স্মিথ জানান, আহতদের মধ্যে অন্তত ১৯ জনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

নিহত চার সেনাসদস্যের পরিচয় প্রকাশ

অগ্নিকাণ্ডে নিহত চার সেনাসদস্যের পরিচয় প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। তাঁরা হলেন সার্জেন্ট মরগান ওং এবং সৈনিক শন ফারেল, এইডান গুল্ডিং ও হেইডেন লাইকমার্ক।

ঘটনাটি কানাডার সামরিক বাহিনীতে শোকের ছায়া ফেলেছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ চলাকালে আগুনের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি কীভাবে এত দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। নাশকতা বা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের কোনো ইঙ্গিত না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং কোন পরিস্থিতিতে তা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

সামরিক প্রশিক্ষণের সময় ছড়িয়ে পড়ে আগুন

কানাডার সামরিক বাহিনীর মেজর জেনারেল ওয়েড রাটল্যান্ড সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় পদাতিক বাহিনীর সদস্যরা ঘাঁটির গ্রেনেড রেঞ্জ ও অ্যাটাক রেঞ্জে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছিলেন। প্রশিক্ষণে আসল গোলাবারুদ ব্যবহার করা হচ্ছিল। এর মধ্যে ছিল গ্রেনেড লঞ্চার, গ্রেনেড, ছোট অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ।

প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার দূরে শুকনো ঘাসে প্রথম আগুন দেখা যায়। বাতাসের অস্বাভাবিক তীব্রতার কারণে আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পরে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তিত হলে আগুন ঘাঁটির প্রশাসনিক এলাকার দিকে অগ্রসর হয়।

সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। সেখানে প্রশিক্ষণরত সেনাসদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আহতদের উদ্ধার করা এবং আগুনের বিস্তার ঠেকানো—সবকিছুই জরুরি হয়ে পড়ে।

তবে আগুনের প্রাথমিক সূত্রপাতের সঙ্গে প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত গোলাবারুদের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।

আলবার্টায় জরুরি অবস্থা, হাসপাতালে নেওয়া হয় আহতদের

অগ্নিকাণ্ডের পর আলবার্টা প্রদেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় তাঁদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়।

ঘটনাস্থল ওয়েনরাইট থেকে আহতদের প্রাদেশিক রাজধানী এডমন্টনের বড় হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হয়। এ কাজে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি ২২টি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ধারকাজের সময় স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতেও ব্যাপক তৎপরতা দেখা যায়। ওয়েনরাইট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়, রাতভর সারিবদ্ধভাবে অ্যাম্বুলেন্স আসতে থাকে। আহতদের আর্তনাদে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তাঁর কাছে পুরো দৃশ্যটি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো মনে হয়েছিল।

আহতদের মধ্যে ১৯ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের শারীরিক অবস্থার পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে হতাহতের পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে সারা রাত অভিযান

অগ্নিকাণ্ডের পর সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে জরুরি সেবাদানকারী দলগুলো আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। বাতাসের তীব্রতা আগুনের বিস্তার ঠেকানোর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আগুনের গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় ঘাঁটির বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়ে।

প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছিল। ফলে আগুন নেভানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সেনাসদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হয়।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বা নাশকতার যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে এ বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে আগুনের কারণ সম্পর্কে তদন্ত শেষ হয়েছে। আগুনের উৎপত্তি, বিস্তারের ধরন এবং হতাহতের পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।

কানাডার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র ওয়েনরাইট

আলবার্টার রাজধানী এডমন্টন থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত কানাডিয়ান ফোর্সেস বেস ওয়েনরাইট দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র। বিশেষ করে আসল গোলাবারুদ ব্যবহার করে সামরিক মহড়া বা লাইভ-ফায়ার প্রশিক্ষণের জন্য ঘাঁটিটি পরিচিত।

কানাডার সেনাসদস্যদের পাশাপাশি দেশটির বন্ধুপ্রতিম বিভিন্ন দেশের সামরিক সদস্যরাও সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। ফলে ঘাঁটিটি শুধু কানাডার সামরিক প্রস্তুতির জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত দিনের বেলায় এই ঘাঁটিতে প্রায় ৬৯০ জন সামরিক কর্মী এবং ৩০০ জন বেসামরিক কর্মী অবস্থান করেন। এ ধরনের বড় প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তাব্যবস্থা, জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণ এলাকার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।

তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা

ওয়েনরাইটের অগ্নিকাণ্ডে চার সেনাসদস্যের মৃত্যু এবং অন্তত ৩৯ জনের আহত হওয়ার ঘটনা কানাডার সামরিক বাহিনীর জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়বে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

সামরিক কর্তৃপক্ষ নাশকতা বা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের কোনো ইঙ্গিত না পাওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ, আগুন ছড়িয়ে পড়ার পেছনে আবহাওয়ার ভূমিকা এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, নিহত সেনাসদস্যদের মৃত্যুর পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

তথ্যসূত্র: বিবিসি


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স