ঢাকা

প্রাথমিকে ফের বাড়ছে ঝরে পড়ার হার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক শিশু। প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ধরে রাখার নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও এক বছরের ব্যবধানে ঝরে পড়ার হার ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সবাই পুরোপুরি শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একটি বড় অংশ সাধারণ বিদ্যালয় ছেড়ে ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসায় ভর্তি হচ্ছে। ফলে প্রকৃত ঝরে পড়া এবং প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের চিত্র আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা।


পরিসংখ্যান ও ব্যানবেইসের সর্বশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (এপিএসএস) ২০২৪-এর ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়। এর আগে ২০২১ সালে এ হার ছিল ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০১০ সালে এ হার ছিল ৩৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। ফলে টানা ১৪ বছর কমার পর আবারও এই হার বাড়ল।


শিক্ষার্থী ধরে রাখতে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ

দীর্ঘদিন পর ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থী ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় ধরে রাখার লক্ষ্যে ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের জুতা, পোশাক, ব্যাগ ও মিড-ডে মিলের পাশাপাশি বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। শ্রেণিকক্ষকে আকর্ষণীয় করতে ‘আনন্দের স্কুল’সহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


মানসম্মত শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার

বিদ্যালয়গুলোর সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানবিক বিকাশ ও নৈতিক চরিত্র গঠনে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি দেশব্যাপী ফুটবল প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ধরে রাখতে উপবৃত্তি ও মেধাভিত্তিক বৃত্তি কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।


বদলাচ্ছে প্রতিষ্ঠান, সবাই ঝরে পড়ছে না

যেহেতু উপাত্তগুলো কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের, তাই ঝরে পড়া হিসেবে চিহ্নিতদের একটি বড় অংশ আসলে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ইংরেজি মাধ্যম কিংবা মাদ্রাসায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। অর্থাৎ, তারা শিক্ষার আলোতেই থাকছে, কেবল প্রতিষ্ঠানের ধরন পরিবর্তন করছে। গবেষণায় দেখা যায়, সার্বিক ঝরে পড়ার চেয়ে এই স্থানান্তরিত হওয়ার হারই বেশি।


মহামারির প্রভাব ও ধারাকেন্দ্রিক শিক্ষার চ্যালেঞ্জ

করোনাভাইরাস মহামারির সময় সাধারণ স্কুল বন্ধ থাকলেও মাদ্রাসাগুলো খোলা ছিল। তখন সন্তানদের পড়াশোনা সচল রাখতে অনেক অভিভাবক মাদ্রাসায় ভর্তি করান, যে প্রবণতা এখনও চলমান। তবে সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলাম আলাদা হওয়ায় এক ধারা থেকে অন্য ধারায় স্থানান্তরিত হতে শিশুদের বেশ সমস্যা হয়। মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বেশি এবং সাধারণ শিক্ষায় বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজিতে জোর দেওয়া হয়। হঠাৎ এই পরিবর্তনে শিশুরা নতুন পরিবেশের সাথে সহজে মানিয়ে নিতে পারে না।


সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিপূরক খাবারের মানোন্নয়ন

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে সঠিক ধারায় রাখার জন্য অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি। এর জন্য স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে পরিবেশ আনন্দদায়ক করা, খাবারের মান বাড়ানো এবং শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি চলমান উদ্যোগগুলোর নিয়মিত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা আবশ্যক।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স