পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলে জানাজা ও মরদেহ দাফনের অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও সবার মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। তবে পোস্টে পিরোজপুরে মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
নাহিদ ইসলাম তাঁর পোস্টে লেখেন, জানাজা পড়া ও মরদেহ দাফন করা প্রত্যেক মানুষের ন্যূনতম মানবিক ও ধর্মীয় অধিকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এ ধরনের অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা আর দেখতে চান না তিনি।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মানবাধিকারের পক্ষেও কথা বলা জরুরি। অতীতে যাঁদের রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে একই ধরনের আচরণ অনুসরণ করা উচিত নয়।
কী ঘটেছিল পিরোজপুরে
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী গত শনিবার মারা যান।
তাঁর মরদেহে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়াকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরে উত্তেজনা দেখা দেয়। জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা তাঁকে পিরোজপুরে দাফন না করার দাবি জানান এবং শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেন।
পরিস্থিতির মধ্যে শনিবার রাতে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় তাঁর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন।
এ ঘটনায় নাহিদ ইসলাম তাঁর পোস্টে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করলেও অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান ঘটনার তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা বিরোধের কারণে কোনো ব্যক্তির জানাজা, দাফন কিংবা মৃত্যুর পর সম্মান পাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
আওয়ামী লীগ আমলের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ
ফেসবুক পোস্টে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধীদের জানাজা ও মরদেহ দাফনের অধিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তিনি পিয়াস করিম ও আল মাহমুদের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ওই সময় বিরোধী দলের অনেক নেতার জানাজা ঢাকায় আয়োজন করতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
নাহিদ ইসলাম লেখেন, ‘জানাজা পড়ার অধিকার, লাশ দাফনের অধিকার যেকোনো মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকার, ধর্মীয় অধিকার।’
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।
অতীতের ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজনৈতিকভাবে বিরোধী বিবেচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও মানবাধিকারের প্রশ্নে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি বিরূপ মনোভাব থাকলেও তাঁদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা যায় না।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার নিয়েও কথা বলার আহ্বান
নিজের পোস্টে নাহিদ ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, অতীতে যাঁদের আওয়ামী লীগের শাসনামলের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচনা করা হতো, তাঁদের মৃত্যুর পরও জানাজা ও শোক প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি লেখেন, গণ-অভ্যুত্থানের পরে ঢাকায় তোফায়ালের জানাজা হয়েছে। নিজের এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম রহমতুল্লাহর জানাজা হয়েছে। সংসদীয় রীতি অনুসারে শোক প্রকাশও করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, রাজনৈতিকভাবে বিরোধী ব্যক্তিদের মানবাধিকারের পক্ষেও তাঁরা কথা বলেছেন এবং ভবিষ্যতেও বলবেন। কারণ, রাজনৈতিক শত্রুর সঙ্গেও ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘কারণ, শত্রুর সঙ্গে আমাদের ইনসাফ করা শিখতে হবে।’
তাঁর বক্তব্যে মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নাহিদ ইসলামের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর মৃত্যুর পর ধর্মীয় ও মানবিক অধিকার খর্ব করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সাঈদীর রায়ের পর সহিংসতার প্রসঙ্গও তুললেন
পোস্টে নাহিদ ইসলাম মানবাধিকারকর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর সারা দেশে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও তখন ঢাকার অনেক মানবাধিকারকর্মী নীরব ছিলেন।
তিনি লেখেন, ‘মানবাধিকারের প্রশ্ন এলে সেসব হত্যার বিচারও হতে হবে।’
এ বক্তব্যের মাধ্যমে নাহিদ ইসলাম মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, মানবাধিকারের প্রশ্নে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া উচিত নয়। অতীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং বর্তমানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
‘ফ্যাসিবাদের বিপরীতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে’
পোস্টের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম অতীতে মরদেহ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ, কবর ভাঙচুর এবং জানাজায় বাধা দেওয়ার বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এসব আচরণ একসময় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।
এ ছাড়া শহীদ ওসমান হাদীর কবর উৎখাতের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এ দাবির পক্ষে পোস্টে বিস্তারিত তথ্য দেননি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, অতীতের অন্যায় ও অমানবিক আচরণের বিরোধিতা করার অর্থ সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি করা নয়। বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভিন্ন দৃষ্টান্ত তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি লেখেন, ‘ফ্যাসিবাদের বিপরীতে আমাদের ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
পোস্টের শেষাংশে পিরোজপুরে মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আবারও নিন্দা জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘আমরা সব নাগরিকের মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকব।’
নাহিদ ইসলামের এ বক্তব্যে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে জানাজা ও দাফনের মতো ধর্মীয় ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর বিচার এবং বর্তমান সময়ে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক এনসিপির আহ্বায়ক। জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্বেও রয়েছেন।