জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে ভারতের উচ্চপর্যায়ের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার গোপন বৈঠক হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. রাশেদ খাঁন। এ অভিযোগকে অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ প্রকাশ্যে তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে দলটি।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়া গোলাম পরওয়ার একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছেন—এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় দলটি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। দলটির দাবি, এ ধরনের খবরের মাধ্যমে জামায়াতের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াতে ইসলামী নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বজায় রেখে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে। কিন্তু সম্প্রতি দলের সেক্রেটারি জেনারেলকে একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বৈঠকের ঘটনায় জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ করা হয়েছে, যা তাঁদের মতে অসত্য।
তিনি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে যাঁরা এ তথ্য ছড়িয়েছেন, তাঁদের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে বলেন।
১৬ সেপ্টেম্বর বারিধারায় বৈঠকের অভিযোগ রাশেদের
এর আগে সোমবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. রাশেদ খাঁন দাবি করেন, গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বারিধারার একটি বাড়িতে ভারতের উচ্চপর্যায়ের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। ওই বৈঠকে জামায়াত নেতা এ টি এম মাছুমসহ মোট তিনজন উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন প্রশ্ন তোলেন, যাঁরা নিয়মিত ভারতের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন, তাঁরা কী কারণে এবং কোন স্বার্থে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।
তিনি লেখেন, ‘কোনো ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করা, আর ভারতীয় উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক হওয়া এক জিনিস নয়।’
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে কথিত গোপন বৈঠককে একইভাবে বিবেচনা করা যায় না। এ কারণে বৈঠকের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তবে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা ওই ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা সরবরাহ করা তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে জামায়াতও অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
অভিযোগের সত্যতা প্রকাশের আহ্বান জামায়াতের
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবৃতিতে বলেন, দলের সেক্রেটারি জেনারেলকে জড়িয়ে যাঁরা অসত্য তথ্য ছড়িয়েছেন, তাঁদের উচিত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণসহ জাতির সামনে প্রকাশ করা।
তিনি বলেন, অসত্য তথ্য দিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলকে জনসমক্ষে বিতর্কিত করার চেষ্টা সফল হবে না বলে দলটি মনে করে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোকে তথ্যের যথার্থতা যাচাই করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত না করে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্যও আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে মিথ্যা প্রচার ও অপপ্রচারের বিষয়ে নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং যাচাই না করা তথ্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দলটি।
আওয়ামী লীগকে নিয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনার অভিযোগ
নিজের ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন আরও দাবি করেন, মিয়া গোলাম পরওয়ার যদি নৈতিক রাজনীতি করে থাকেন, তাহলে তাঁর কথিত গোপন বৈঠকের বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত।
তিনি লেখেন, ‘মিয়া গোলাম পরওয়ার যদি নৈতিক রাজনীতি করে থাকেন, আশা করি তিনি গোপন এই বৈঠকের বিষয়টি খোলাসা করবেন।’
এরপর তিনি অভিযোগ করেন, বৈঠকের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা না হলে জামায়াত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। তাঁর পোস্টে আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে জামায়াতের আন্দোলনের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনা কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ সরবরাহ করা বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বক্তব্যকে রাশেদ খাঁনের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে জামায়াতের বিবৃতিতে এসব অভিযোগের সরাসরি বিস্তারিত জবাব না দিয়ে মূলত কথিত বৈঠকের খবরকে অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং অভিযোগকারীদের প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিতর্কে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব
মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার কথিত বৈঠক নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে রাশেদ খাঁন বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ ও স্থান উল্লেখ করে অভিযোগ তুলেছেন; অন্যদিকে জামায়াত অভিযোগটিকে অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে কথিত বৈঠকটি সত্যিই হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিস্তারিত বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে জাতীয় রাজনীতি ও বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, রাশেদ খাঁনের অভিযোগের জবাবে জামায়াত প্রমাণ উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তবে কথিত বৈঠকের বিষয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি হতে হলে অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ সামনে আসা প্রয়োজন।