ঢাকা

আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি, ‘ক্রসফায়ারে’ জিরো টলারেন্সের কথা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

আইজিপির বক্তব্যকে অসতর্কতাজনিত উল্লেখ করে নাকচ করেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ; বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু সরকার সহ্য করবে না বলে জানিয়েছেন তিনি

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যকে নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না; বরং এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। আইজিপি অসতর্কতাবশত ওই বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁর এভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইজিপি অসতর্কতাবশত ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষায়, “উনি (আইজিপি) সহজ–সরল মানুষ। আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়ে বলতে গিয়ে অসতর্কতাবশত বলে ফেলেছেন। এটা ঠিক হয়নি, উচিত হয়নি।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, সরকার ক্রসফায়ার চায় না এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে দেবে না। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু বা কাস্টডিয়াল ডেথের বিষয়েও সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানান তিনি।

আইজিপির বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ মন্তব্য এল। এর আগে সোমবার রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেছিলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। তাঁর ওই বক্তব্যের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। পরে পুলিশ সদর দপ্তরও বক্তব্যটির ব্যাখ্যা দেয়।

‘বিচারবহির্ভূত হত্যা হতে দেবে না সরকার’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অপরাধ দমন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।

তবে অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা সরকার মেনে নেবে না বলে জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ক্রসফায়ারে মৃত্যু কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো সুযোগ নেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, কঠোর আইন প্রয়োগের অর্থ বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে হত্যা করা নয়।

চকবাজারে আইজিপির বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক

সোমবার রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে।

আইজিপি আরও বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে, আবার পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকলে তাকে দুর্বল হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন এ নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে।

সমালোচনার মুখে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বক্তব্যটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার অর্থে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতেই তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরদিন আইজিপির বক্তব্যকে অসতর্কতাজনিত বলে উল্লেখ করে বলেন, এভাবে কথা বলা উচিত হয়নি।

রিজভীর বক্তব্য, সরকারের জন্য বিব্রতকর

আইজিপির বক্তব্য নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।

রিজভী বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর। দীর্ঘদিন ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় পুলিশপ্রধানের মুখে এ ধরনের বক্তব্য তাঁদের ভাবিয়ে তুলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্বেগ ছিল, যে দল অতীতে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার ছিল, সেই দলের সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে এমন বক্তব্য আসা কতটা গ্রহণযোগ্য।

বিভিন্ন দলের ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

আইজিপির বক্তব্যের পরপরই জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং মানবাধিকার সংগঠন প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা বক্তব্যটি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিসরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ প্রেক্ষাপটে আইজিপির বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে, অপরাধ দমনে পুলিশের কঠোর ভূমিকার কথা বলার সময় ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের ব্যবহার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেন সমালোচকেরা।

আইন প্রয়োগ ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরোধী—এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইজিপির বক্তব্যকে অসতর্কতাজনিত বলে নাকচ করায় সরকারের অবস্থান এবং পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন হলেও তা আইনের শাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই পরিচালিত হতে হবে—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বার্তা এটাই। অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তা সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

এখন আইজিপির বক্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করলেও, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কী ধরনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে—সেই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স