প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি—এই পাঁচটি প্রধান বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রাথমিক ও শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও সরকারের বিভিন্ন দূরদর্শী পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
প্রতিমন্ত্রী প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ, মিড-ডে মিল সম্প্রসারণ, ক্লাসরুমের ডিজিটালাইজেশন এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স, সক্ষমতা ও শিখন চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে একটি পরিমার্জিত ও উন্নত কারিকুলাম প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-কে এই গুরুদায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। নতুন এই কারিকুলামের মাধ্যমে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিদ্যমান শিখন ঘণ্টার বৈষম্য দূর করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান ও শিখন উপকরণকে আরও বিজ্ঞানসম্মত, সহজবোধ্য ও বয়সোপযোগী করে তুলতেই এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
শিশুরা যেন শ্রেণিকক্ষে খেলতে খেলতে আনন্দময় পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, প্রথাগত বাঁধাধরা পড়াশোনার বাইরে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি খেলাধুলার উপযোগী শিক্ষণীয় খেলনার মাধ্যমে শিক্ষকরা যাতে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় উপায়ে পাঠদান করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে বুনিয়াদি দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার এবং গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হবে।
শিক্ষার্থীদের স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচিকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে অভিহিত করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ১৫১টি উপজেলায় এই কর্মসূচি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বাকি উপজেলাগুলোতেও এর আওতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতভাগ শিশুর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার পরিবেশন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
খাবারের মান এবং বিতরণে স্বচ্ছতা রাখতে স্থানীয় মায়েদের নিয়ে গঠিত ‘মাদার্স কমিটি’র মাধ্যমে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি কেবল কিছু ডিভাইস বিতরণের প্রকল্প নয়। গুগলসহ বৈশ্বিক বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের হাতে ট্যাব পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এটি একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে।
এর ফলে কোনো শ্রেণিকক্ষে সিলেবাস শেষ করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না কিংবা শিক্ষার্থীরা কোথায় বুঝতে পারছে না, তা তাৎক্ষণিকভাবে মনিটরিং করা যাবে। এমনকি যেসব দুর্গম অঞ্চলে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে যৌথ সমঝোতার মাধ্যমে সোলার প্যানেল স্থাপন ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি জানান।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অবকাঠামো কেবল চার দেয়ালের ভবননির্ভর হলে চলবে না; বরং শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, আধুনিক শৌচাগার এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা পুরোপুরি শিশুবান্ধব হতে হবে। নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ি অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করে টেকসই ও উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন কেবল ভবন নির্মাণ বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ে এসে প্রকৃত অর্থে শিখছে কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি—এই পাঁচটি খাত একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত বিধায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিতভাবে এই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।



