যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আবদুল এল সাঈদ। দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনে জয়লাভ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তিনি পরাজিত করেন রিপাবলিকান পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী মাইক রজার্সকে।

ভোটের ব্যবধান ও প্রাথমিক ফলাফল


রয়টার্সের প্রতিবেদন এবং জিভি ওয়্যারের প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আবদুল এল সাঈদ পেয়েছেন ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৫৪৩ ভোট, যা মোট গণনা করা ভোটের ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছেন ১৭ লাখ ৭৯ হাজার ১০১ ভোট বা ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ। ভোট গণনা যখন এই পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন অঙ্গরাজ্যটির প্রায় ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন · inarticle_1


মিশিগানের এই সিনেট আসনটি ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্রেটিক পার্টির দখলেই ছিল। এর আগে এই আসনে দুই মেয়াদে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করা সিনেটর গ্যারি পিটার্স অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। সেই শূন্য আসনে ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন পান এল সাঈদ। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা এই আসনে প্রার্থী করেছিল সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও এফবিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাইক রজার্সকে।


নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও এজেন্ডা


৪২ বছর বয়সী আবদুল এল সাঈদ পেশায় একজন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এর আগে তিনি মিশিগানের ডেট্রয়েট ও ওয়েইন কাউন্টির জনস্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি ২০১৮ সালে তিনি মিশিগানের গভর্নর পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যদিও সেবার তিনি জয়ী হতে পারেননি। এবারের সিনেট নির্বাচনে তাঁর প্রচারণায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব সীমিত করা এবং সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়।


তাঁর নির্বাচনী কর্মসূচির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল ‘মেডিকেয়ার ফর অল’। এই কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সরকারি অর্থায়নে বিনামূল্যে বা সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন তিনি।


প্রচারাভিযানে বিতর্ক ও পররাষ্ট্র নীতি


নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময় জুড়েই এল সাঈদের ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করা হয়। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স এবং তৎকালীন রাজনৈতিক মহলের একাংশ তাঁর বিরুদ্ধে বিতর্কিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলেন। এমনকি তাঁকে উগ্রপন্থার প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবেও চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। তবে এল সাঈদ শুরু থেকেই এই সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তাঁর বিরোধীরা এই অভিযোগের পক্ষে কখনোই কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা এই ধরনের প্রচারণাকে স্পষ্ট ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণ বলে নিন্দা জানান।


এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বিশেষ করে ইসরায়েল-গাজা সংঘাতের বিষয়টিও তাঁর নির্বাচনী প্রচারে বড় প্রভাব ফেলেছিল। এল সাঈদ প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা প্রদানের বিরোধিতা করেন এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই স্পষ্টভাষী অবস্থানের কারণে তাঁকে কিছু ইহুদি ভোটার ও মধ্যপন্থী ডেমোক্রেটিক নেতার সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়।


অন্যদিকে, পরাজিত রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। তিনি মূলত কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কর ছাড় প্রদান এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বৃদ্ধির ইস্যুগুলো শেষ পর্যন্ত মাইক রজার্সের পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে।


মার্কিন কংগ্রেসে ঐতিহাসিক মাইলফলক


যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে মোট আসন ১০০টি। মিশিগানের এই একটি আসনে এল সাঈদের জয় পাওয়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় যুক্ত হলো। এর আগে দেশটির প্রতিনিধি পরিষদে (নিম্নকক্ষ) বেশ কয়েকজন মুসলিম আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হননি। তাঁর এই বিজয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মার্কিন সিনেটে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলো।