জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে সরকার আন্তসংস্থা সমন্বয়ের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে।
বুধবার সংসদে আলাদা দুটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ–এর সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে নির্ধারিত আধা ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী জানান, আন্তসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা
প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–র পরিবারসহ মোট ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ জড়িত। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী—এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল ও সামিট গ্রুপ।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। বছরে গড়ে এর পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার।
১০ দেশে অনুসন্ধান, এমএএলটি চুক্তির উদ্যোগ
পাচার হওয়া অর্থের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশ হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়না। প্রধানমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (এমএএলটি) স্বাক্ষরে সম্মতি দিয়েছে। বাকি সাত দেশের সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়াধীন।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।
২৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আদালত দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছেন বলে সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী। দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ পর্যন্ত ১৪১টি মামলা করা হয়েছে; ১৫টির অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় হয়েছে।
‘আইনের পথেই শাস্তি’
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আইনের শাসনে বিশ্বাসী। “আইন তার নিজস্ব গতিতে এগোবে। যারা জনগণের অর্থ পাচার করেছে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হবে,”—বলেন তিনি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটি জনগণের অর্থ। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকার সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, যাতে অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে জনকল্যাণে ব্যয় করা যায়।”
ফ্যামিলি কার্ড: নারীপ্রধান পরিবারে সহায়তা
সরকারি দলের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ১০ মার্চ ১৩ জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও ৩০ হাজার পরিবার যুক্ত হবে। আগামী চার বছরে ৪ কোটি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড নারী সদস্যের নামে দেওয়ার ফলে পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা জোরদার হবে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার টাকা ছাপিয়ে এ সহায়তা দিচ্ছে না। বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ নির্বাচনে যে সমর্থন দিয়েছে, তাতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রতি আস্থা প্রতিফলিত হয়েছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সংসদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলেও তিনি জানান।