স্বাধীনতার ঘোষণার প্রেক্ষাপট ও ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধের উদ্ধৃতি তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘অনিবার্য চরিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, অতীতে যেভাবে জিয়াউর রহমানের অবদানকে খাটো করার চেষ্টা হয়েছে, তা থেকেই প্রমাণিত হয়—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য।
শুক্রবার মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
‘স্বাধীনতার চিন্তাচেতনা ধারণ করতেন জিয়া’
তরুণ প্রজন্মের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান প্রথম জীবনে রাজনৈতিক কর্মী না হলেও স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন।
“তিনি ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা, কিন্তু সচেতনভাবেই স্বাধীনতার চিন্তাচেতনা ধারণ করতেন। একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন গভীরভাবে লালন করতেন,” বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, জিয়াউর রহমান হঠাৎ করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি; বরং এর পেছনে ছিল দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি। “তিনি অপেক্ষায় ছিলেন উপযুক্ত মুহূর্তের,” যোগ করেন তিনি।
‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধের প্রসঙ্গ
তারেক রহমান বলেন, তাঁর বক্তব্য ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ নয়; বরং জিয়াউর রহমানের নিজের লেখা থেকেই তা স্পষ্ট। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক প্রবন্ধের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণার প্রেক্ষাপট ও মানসিক প্রস্তুতির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
তিনি জানান, প্রবন্ধটির একটি অংশে জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন—
“তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্তের আখরে আখরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন...”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটের ঘটনাপ্রবাহ এবং প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হতে পারে। তাঁর দাবি, যুদ্ধোত্তর সময়ে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর কোনো পক্ষ থেকে তা খণ্ডনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় পুনর্মুদ্রণের সময়ও আপত্তি ওঠেনি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অতীত–বর্তমানের ভারসাম্য
বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, অতীতকে পুরোপুরি ভুলে গেলে যেমন ক্ষতি, তেমনি অতীত নিয়েই পড়ে থাকাও ভবিষ্যতের পথে বাধা হতে পারে।
“অতীত ভুলে গেলে দুই চোখ অন্ধ, আর শুধু অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ,”—এভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন তিনি।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়। তবে আলোচনা, সমালোচনা বা গবেষণার নামে এমন কিছু করা উচিত নয়, যা মুক্তিযুদ্ধের গৌরব বা ইতিহাসকে খাটো করে।
‘মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ’
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি ছিল ‘জনযুদ্ধ’—এ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর অর্জিত স্বাধীনতার মূল্য উপলব্ধি করতে হলে স্বাধীনতাকামী জাতির অভিজ্ঞতার দিকে তাকাতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনের মানুষের সংগ্রামের কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “লাখো প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পরবর্তী সময়েও জনগণের অধিকার রক্ষায় বহু প্রাণ উৎসর্গ হয়েছে। প্রতিটি শহীদের স্বপ্ন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।”
উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, লক্ষ্য হলো স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়া।
“সমাজের একটি অংশ নয়, আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব—এটাই হোক এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার,” বলেন তিনি।
নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ, অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সভায় অংশ নেন।
সভায় বক্তারা মহান স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রজন্মান্তরে সঠিক উপস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।