জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও Shafiqur Rahman। তিনি বলেন, এই আন্দোলন এখন আর শুরুর অপেক্ষায় নেই, বরং “তিলে তিলে তা সফলতার দিকে এগিয়ে নিতে হবে।”
সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)-এর মুক্তিযোদ্ধা হল মিলনায়তনে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ১১-দলীয় ঐক্য।
‘রাজপথের আন্দোলনই চূড়ান্ত লক্ষ্য’
শফিকুর রহমান বলেন, “সারা দেশে আন্দোলন চলছে। শুরু হবে কি, শুরু তো হয়েই গেছে।” তিনি আরও বলেন, রাজপথের আন্দোলন সফল করেই বিরোধী দল ঘরে ফিরবে এবং এজন্য দেশবাসীর সমর্থন প্রয়োজন।
তিনি দাবি করেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ফল। তাঁর ভাষায়, “জুলাই আছে আমরা আছি, জুলাই আছে সরকার আছে, জুলাই আছে বিরোধী দল আছে, জুলাই নাই কিছুই নাই।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কোনো পক্ষ টিকে থাকতে পারবে না এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়ই চূড়ান্ত হবে।
সংসদ, রাজনীতি ও ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ নিয়ে মন্তব্য
বিরোধীদলীয় নেতা সংসদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, সংসদে নানা সিদ্ধান্তের পেছনে অদৃশ্য প্রভাব কাজ করছে এবং জনগণ তা বুঝতে পারছে।
তিনি বলেন, “ওই ঘুড়ির নাটাই কোথা থেকে টানা হয়, জাতি বুঝে।” তাঁর মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, সংসদে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমনের চেষ্টা হলেও তারা তা মোকাবিলা করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
রাজনৈতিক সংস্কার ও ‘গোলামির রাজনীতি’ নিয়ে কঠোর অবস্থান
তিনি বলেন, বিরোধী দল ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য রাজনীতিতে নেই। বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই তাদের লক্ষ্য।
“আমরা আমাদের সন্তানদের কারও গোলাম বানাতে চাই না,”—এমন মন্তব্য করে তিনি রাজতন্ত্র বা এককেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও অবস্থান জানান।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে, না হলে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ
ইসলামী ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখা ব্যাংকগুলোকে কোনোভাবেই দলীয়করণ করা যাবে না।
তিনি বলেন, “ব্যাংক জনগণের সম্পদ, জনগণকেই এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।” অন্যথায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বক্তব্য
সেমিনারে বক্তব্য দেন National Citizen Party (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক Nahid Islam। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন প্রয়োজন। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্ক জনগণের সংস্কার আকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
অন্যান্য নেতাদের বক্তব্যে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনা
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। Moulana Mamunul Haque বলেন, বর্তমান সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষই জনগণকে অবমূল্যায়ন করছে।
তিনি দাবি করেন, গণভোটকে উপেক্ষা করা হলে তা ইতিহাসে ভুল দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে।
Mia Golam Porwar বলেন, বিএনপি এখন কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে।
Ali Ahsan Mohammad Mojaheed এবং অন্যান্য বক্তারাও রাজনৈতিক সংস্কার ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আইন ও সংবিধান প্রসঙ্গ
সেমিনারে আইন বিশেষজ্ঞ শিশির মনির বলেন, আদালতে বিষয়টি উপস্থাপিত হলে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে কিছু বক্তা সরকারের অবস্থান ও আইন প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা করেন এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মতবিরোধ, উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অঙ্গন
সেমিনারে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকরা একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন। কেউ সরকারকে সমালোচনা করেন, কেউ বিরোধী দলকে দায়ী করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকরা বলেন, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সার্বিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার ইস্যু বর্তমানে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ ইস্যু ঘিরে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে মতবিরোধ আরও তীব্র হচ্ছে।