ঢাকা

ইরানের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে উত্তেজনা বাড়ছে—সিএনএন রিপোর্ট

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই—ডিজিটাল জগত, তথ্যপ্রবাহ এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপও হয়ে উঠেছে আধুনিক সংঘাতের প্রধান মঞ্চ। সাম্প্রতিক এক সংঘাতপর্বে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সাইবার ও তথ্যযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর বিশ্লেষণ ও আঞ্চলিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে শুধু সামরিক হামলাই নয়—ভুয়া বার্তা, সাইবার আক্রমণ ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ভীতি ছড়ানোর মাধ্যমে একটি সমান্তরাল যুদ্ধ চালানো হয়েছে।

ভুয়া এসএমএস ও আতঙ্কের বিস্তার

সংঘাত চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দাদের কাছে একটি খুদে বার্তা (এসএমএস) পৌঁছে যায়, যেখানে নিরাপত্তাজনিত ঘটনার তথ্য দিতে বলা হয়। তবে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে জানায়, তারা এমন কোনো বার্তা পাঠায়নি এবং এটি ছিল ভুয়া তথ্য।

এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, যুদ্ধের সময় শুধুমাত্র সামরিক নয়—ডিজিটাল বিভ্রান্তি ছড়িয়েও জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে।

সাইবার হামলার ঢেউ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাইবার নিরাপত্তা প্রধান মোহাম্মদ আল–কুয়েতির বরাতে জানা যায়, যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগেই সাইবার হামলা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ইরানের মিত্রপক্ষগুলোর সাইবার আক্রমণ দিনে প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছে যায়, যার লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানে ইন্টারনেট সীমিত থাকলেও দেশের বাইরে থাকা ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠীগুলো ধারাবাহিকভাবে ফিশিং, তথ্যচুরি এবং ধ্বংসাত্মক সাইবার কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, শুরুতে এসব আক্রমণ তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা সরাসরি ক্ষতিসাধনের দিকে মোড় নেয়।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডসের নামে পাঠানো বিভিন্ন বার্তায় ইসরায়েলিদের উদ্দেশে ভয়ভীতি ছড়ানো হয়। একাধিক হুমকিমূলক বার্তায় বলা হয়, ‘মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও’।

অন্যদিকে গাজা ও লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি ভুয়া বার্তার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার মতো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়।

এ ধরনের কৌশলকে বিশেষজ্ঞরা ‘সাইকোলজিক্যাল অপারেশন’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি খাতে আঘাত

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের ওয়েব সার্ভারে সাইবার হামলা চালানো হয়, যার ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে এবং আর্থিক লেনদেন সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া মেটা, ওরাকল, এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তালিকা প্রকাশ করে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনাও ঘটে, যার ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাজনিত কারণে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করতে নির্দেশ দেয়।

কৌশলগত লক্ষ্য: আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা

নিরাপত্তা বিশ্লেষক পাওলো নাপোলিতানো বলেন, আধুনিক যুদ্ধে সাইবার ও তথ্যযুদ্ধ এখন অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তার মতে, ইরান প্রথাগত সামরিক শক্তির বাইরে গিয়ে প্রতিপক্ষের অর্থনীতি ও জনমনে চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে।

তার ভাষায়, “এই ধরনের হামলার মূল লক্ষ্য হলো উপসাগরীয় দেশগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের স্থিতিশীল ভাবমূর্তি নষ্ট করা।”

প্রযুক্তি অবকাঠামোয় অনুপ্রবেশ

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-সমর্থিত হ্যাকাররা শুধু সরকারি নেটওয়ার্ক নয়, নজরদারি ক্যামেরা, গৃহস্থালি নিরাপত্তা ডিভাইস এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও প্রবেশের চেষ্টা করেছে।

জর্ডানের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র জানিয়েছে, গম সংরক্ষণাগারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়ও অনুপ্রবেশের চেষ্টা হয়েছিল, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারত।

তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতি

যুদ্ধ চলাকালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে তথ্য নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা হয়। কিছু দেশে যুদ্ধ-সম্পর্কিত ভিডিও বা তথ্য শেয়ার করার কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্ব-নিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বৃদ্ধি পায়।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই কৌশলগত যুদ্ধের বড় অংশই ছিল অপ্রতিসম (asymmetric) পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে, যেখানে সরাসরি সামরিক শক্তির পরিবর্তে প্রযুক্তি, তথ্য এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

অ্যান্ডি পিয়াজা বলেন, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন সরাসরি সাইবারজগতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এসব হামলা আগের তুলনায় অনেক বেশি সুসংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে।


বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ডিজিটাল ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ কেবল সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো ও তথ্যপ্রবাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। সামনের দিনে এই ধরনের ‘অদৃশ্য যুদ্ধ’ আরও বিস্তৃত ও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স