মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে নতুন করে কঠোর মন্তব্য করেছেন ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক শীর্ষ কমান্ডার ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি ইরানে স্থল অভিযান শুরু করার আহ্বানমূলক মন্তব্য করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
সাম্প্রতিক বক্তব্যে রেজায়ি দাবি করেন, কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি–তে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে রয়েছে। তার ভাষায়, এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন নৌবাহিনী “ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার সরাসরি নিশানায়” রয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালিতে “পুলিশের ভূমিকা” নিতে চায়, তবে ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাবে।
তিনি বলেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজের দিকে তাক করা রয়েছে।
তার ভাষায়, “প্রথম আঘাতেই এসব জাহাজ ডুবে যাবে”—যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত উসকানিমূলক বক্তব্য।
স্থল অভিযানের প্রসঙ্গে বিতর্কিত মন্তব্য
সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তার স্থল অভিযানের প্রসঙ্গে মন্তব্য। রেজায়ি বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান শুরু করে, তবে তা ইরানের জন্য “সুবর্ণ সুযোগ” হবে।
তার দাবি, এমন পরিস্থিতিতে ইরান হাজার হাজার বিদেশি নাগরিককে জিম্মি করে তাদের বিনিময়ে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে—যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হলেও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে অভ্যস্ত এবং প্রস্তুত।
যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার অবস্থান
রেজায়ি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি বর্তমান যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার পক্ষে নন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব নেবে বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের আলোচনায় ইরান আগের তুলনায় আরও কঠোর অবস্থান নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করবে।
কৌশলগত বার্তা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, রেজায়ির বক্তব্য শুধু সামরিক হুমকি নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তা। এর মাধ্যমে ইরান তার প্রতিপক্ষকে দেখাতে চায় যে তারা কৌশলগত জলপথ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে আপস করতে প্রস্তুত নয়।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের সাবেক আইআরজিসি প্রধানের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থল অভিযান ও নৌযুদ্ধের মতো ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি বক্তব্যই সম্ভাব্য সংঘাতের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।