ঢাকা

প্রকাশ্যে নয়, পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা নিয়ে বাড়ছে কৌতূহল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য পরোক্ষ আলোচনা নতুন মোড় নিয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর লক্ষ্যে তেহরান একাধিক দেশের সঙ্গে গোপন ও সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Abbas Araghchi গত কয়েক দিনে পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়াসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কেন্দ্র সফর করেছেন। একই সময়ে তিনি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ রাখছেন।

৭২ ঘণ্টার কূটনৈতিক ঝড়: মাসকট, ইসলামাবাদ ও সেন্ট পিটার্সবার্গ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ট্র্যাক সক্রিয় হয়—

ওমানের মাসকটে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দফা সফর
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin–এর সঙ্গে বৈঠক

সূত্রগুলো জানিয়েছে, মাসকট বৈঠকে বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মূল আলোচ্য ছিল হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নৌচলাচল এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রাথমিক কাঠামো।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পারমাণবিক ইস্যু সেখানে আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আলাদা ট্র্যাক হিসেবে সংরক্ষিত।

পাকিস্তান: কূটনৈতিক মধ্যস্থতার কেন্দ্রবিন্দু

এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান–প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হিসেবে কাজ করছে।

পাকিস্তানে বৈঠক করেছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী—

প্রধানমন্ত্রী Shehbaz Sharif
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার
সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এখন “নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী” হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: প্রকাশ্যে কঠোর, পর্দার আড়ালে অনিশ্চিত

হোয়াইট হাউস ইরানের প্রস্তাব সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র গণমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আলোচনা করবে না।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump স্পষ্টভাবে বলেছেন—
ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ বন্ধ করতে হবে।

তিনি একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান চাইলে যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে, তবে শর্ত পূরণ না হলে আলোচনা অর্থহীন।

হরমুজ প্রণালি: কূটনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র

সংকটের মূল কেন্দ্র এখন হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালি শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি এখন ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অন্যতম হাতিয়ার।

ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নৌপথে স্বাভাবিকতা ফিরবে না।

আঞ্চলিক কূটনীতি: টেলিফোন কূটনীতি থেকে সক্রিয় সমঝোতার চেষ্টা

পাকিস্তান, রাশিয়া ও ওমান সফরের পাশাপাশি আরাগচি কাতার, সৌদি আরব, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

এছাড়া কাতারের প্রধানমন্ত্রী Mohammed bin Abdulrahman Al Thani সরাসরি সতর্ক করেছেন যাতে হরমুজ প্রণালি রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার না হয়।

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানও সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।

রাশিয়ার ভূমিকা: নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ

রাশিয়া এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরোক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মস্কো জানিয়েছে, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত ও নিরাপত্তা ইস্যুতে তারা প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এখানে—

মধ্যস্থতাকারী নয়
কিন্তু শক্তিশালী “ভারসাম্যকারী খেলোয়াড়”
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: সমঝোতা কতটা সম্ভব?

বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করছেন, এই মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা এখনো অনেক দূরের বিষয়।

কারণ—

ইরান শুধু পারমাণবিক ইস্যু নয়, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের দাবি তুলছে
উপসাগরীয় দেশগুলো বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়
যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থানে আছে

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের দানিয়া থেফার বলেন, এটি এখনও পূর্ণাঙ্গ জোট পরিবর্তনের সংকেত নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও সতর্ক কূটনৈতিক যোগাযোগ।

সময়ের চাপ: যুদ্ধ, কংগ্রেস ও বৈশ্বিক রাজনীতি

বর্তমান পরিস্থিতিতে একাধিক সময়সীমা একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে—

মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন সময়সীমা
আসন্ন মার্কিন–চীন কূটনৈতিক বৈঠক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক উত্তেজনা

এই সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে।

উপসংহার: পর্দার আড়ালে কি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা?

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক এখন সরাসরি আলোচনার বাইরে গিয়ে “মাল্টি-চ্যানেল পরোক্ষ কূটনীতি”র দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি বা আলোচনার ঘোষণা নেই, তবুও পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়াকে কেন্দ্র করে যে কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, তা নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কিনা—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স