গাজায় যুদ্ধ বন্ধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হামাসের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মিসরে বৈঠক করেছেন তাঁর জামাতা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জ্যারেড কুশনার। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলেও গাজায় যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সংগঠনটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।
রোববার ফিলিস্তিনি একটি সূত্র বৈঠকের বিষয়টি জানিয়েছে। সূত্রটির দাবি, মিসরের আলামেইন শহরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হামাসের নেতারা গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো কুশনারের কাছে তুলে ধরেন। অন্যদিকে কুশনার তাঁদের জানান, গাজার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না।
বৈঠকে গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব ধীরে ধীরে একটি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর, ভবিষ্যৎ গাজা প্রশাসনে হামাসের কোনো ভূমিকা না রাখা এবং সংগঠনটির অস্ত্র ও সামরিক অবকাঠামো পরিত্যাগের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
কুশনারের হামাসের সঙ্গে এই সরাসরি যোগাযোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে এসেছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, গাজায় মানবিক সংকট গভীর হওয়া এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার প্রয়োজনীয়তার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে হামাসের সঙ্গে আলোচনায় বসছে।
যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, মিসরের আলামেইনে হামাস ও কুশনারের বৈঠকে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সেগুলো কীভাবে যাচাই করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আলোচনায় বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে গাজায় যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখা, উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর শুরু করা এবং ভবিষ্যতে গাজা পরিচালনায় হামাসের কোনো ভূমিকা না রাখা।
এ ছাড়া হামাসকে গাজার শাসনক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সব অস্ত্র ও সামরিক অবকাঠামো পরিত্যাগ করতে হবে—এমন শর্তও আলোচনায় এসেছে। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হিসেবে গাজাকে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য আর কোনো ‘সন্ত্রাসের’ উৎস হতে না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
বৈঠকে হামাসের রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হায়াও উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদ, কাতারের কূটনীতিক আলি আল-থাওয়াদি এবং তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও আলোচনায় অংশ নেন।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গঠিত শান্তি পর্ষদ বা ‘পিস বোর্ড’-এর দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এবং পর্ষদের সদস্য ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও কুশনারের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেন।
ফলে এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও হামাসের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল না; বরং গাজা যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত একাধিক পক্ষের অংশগ্রহণে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ ছিল।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য
কুশনারের মিসর ও ইসরায়েল সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গাজা পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হওয়া মতপার্থক্য কমানো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের ঘোষিত পরিকল্পনাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে ইসরায়েলের জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে গাজা যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে যুদ্ধ বন্ধ করে গাজায় নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির পথ খুঁজছে, সেখানে ইসরায়েল হামাসের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে।
এই অবস্থায় কুশনারের সফরকে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
হামাস বলছে, তারা পরিকল্পনা গ্রহণে প্রস্তুত
কুশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী ও এর নিশ্চয়তাদাতা দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তারা এ অবস্থান জানিয়েছে।
হামাসের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের শর্ত তারা পুরোপুরি মেনে চলেছে। কিন্তু ইসরায়েল ওই ধাপ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। বরং ইসরায়েল স্থল অভিযান বাড়িয়ে গাজার মানবিক সংকট আরও গভীর করেছে এবং প্রকাশ্যেই ট্রাম্পের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সংগঠনটি মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো ও শান্তি পর্ষদকে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য করা, হামলা ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা এবং ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার সময়সূচি তৈরির আহ্বান জানিয়েছে তারা।
হামাসের নেতা খলিল আল-হায়া রোববার মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হামাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কেন
হামাসকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে। এই অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংগঠনটির সরাসরি যোগাযোগ বরাবরই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
তবে গাজা যুদ্ধের বাস্তবতায় পরিস্থিতি বদলেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, জিম্মি বিনিময়, হামাসের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সমঝোতা এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ—এসব প্রশ্নের কোনো সমাধানই হামাসকে আলোচনার বাইরে রেখে সহজে করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতার কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে হামাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
কুশনারের সঙ্গে হামাস নেতাদের বৈঠক সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন একদিকে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও রাজনৈতিকভাবে গাজার প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার শর্ত দিচ্ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য সংগঠনটির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে।
হামাসকে প্রশাসন থেকে সরানোর পরিকল্পনা
ট্রাম্পের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যুদ্ধের পর গাজায় হামাসের প্রশাসনিক ভূমিকা না থাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হলে ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে প্রত্যাহার করা হবে এবং হামাস অস্ত্র ত্যাগ করবে। এরপর একটি নতুন বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি তাই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তবে এই কাঠামো বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে, কারা এতে থাকবেন এবং হামাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে—এসব প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
অন্যদিকে হামাস বলছে, যুদ্ধ আবার শুরু হওয়া ঠেকাতে তারা পরিকল্পনাটি গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তবে তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি টেকসই করতে হলে আগে ইসরায়েলকে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামলা বন্ধ করার বিষয়টি তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।
কুশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর সিসির সঙ্গে আলোচনা
হামাসের সঙ্গে বৈঠক শেষ করার পর কুশনার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন।
মিসরের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে গাজা পরিস্থিতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও মিসরের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আল-সিসি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং অভিন্ন স্বার্থের বিভিন্ন বিষয়ে চলমান সহযোগিতার প্রশংসা করেন।
কুশনারও মিসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের প্রশংসা করেন এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আল-সিসির ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
গাজা যুদ্ধের শুরু থেকেই মিসর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। গাজার সঙ্গে মিসরের সীমান্ত থাকায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের চলাচলের প্রশ্নেও দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েলের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর উদ্বেগ
ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করায় রোববার মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এর নিন্দা জানিয়েছেন।
তাঁরা ইসরায়েলের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রচেষ্টা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তাঁদের বক্তব্য, ইসরায়েল যদি পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এর সম্পূর্ণ দায় ইসরায়েলকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনাটি মেনে নিতে ইসরায়েলকে বাধ্য করার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আরও বলেন, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো পক্ষ বাধা দিলে তা দ্রুত মোকাবিলার জন্য শান্তি পর্ষদের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে কুশনারের বৈঠক
এদিকে ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমবার কুশনার ও শান্তি পর্ষদের দূত নিকোলাই ম্লাদেনভের ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
গাজায় হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড বন্ধে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েল উদ্বিগ্ন বলেও ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এই বৈঠক তাই কুশনারের কূটনৈতিক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছে। একদিকে তিনি হামাসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছেন, অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনায় বসছেন। ফলে গাজা যুদ্ধের দুই প্রধান পক্ষের অবস্থান কাছাকাছি আনার চেষ্টা যে তাঁর সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য, তা স্পষ্ট।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কী আছে
গত মাসে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর প্রস্তাবিত পরিকল্পনা যুদ্ধ বন্ধের পথে একটি বড় অগ্রগতি এবং ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই এতে সম্মত হয়েছে।
পরিকল্পনায় গাজায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে সরিয়ে নেওয়া, হামাসের অস্ত্র ত্যাগ এবং পরে নতুন একটি বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে গাজা পুনর্গঠনের কথা রয়েছে।
তবে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে হামাসকে অস্ত্র ত্যাগে রাজি করানো এবং ইসরায়েলকে সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ ও সেনা প্রত্যাহারে সম্মত করানো—দুই ক্ষেত্রেই বড় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাধা রয়েছে।
হামাস পরিকল্পনাটি গ্রহণের ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান জানালেও শর্ত হিসেবে ইসরায়েলকে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে বলছে। অন্যদিকে ইসরায়েল পরিকল্পনাটিকেই ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছে।
ফলে একই পরিকল্পনা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের এই বৈপরীত্যই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
গাজায় আবারও ইসরায়েলি হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে গাজায় ইসরায়েলি হামলা কিছুটা কমে এলেও গত কয়েক দিনে আবার বিমান হামলা শুরু হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
রোববার খান ইউনিসে একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরের একটি আবাসিক ভবনেও বিমান হামলা হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি সরকারি সূত্রের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৩ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে।
এই বাস্তবতায় কুশনারের হামাসের সঙ্গে বৈঠককে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, মাঠের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক।
সামনে বড় পরীক্ষা কূটনীতির
গাজা যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকা হামাস ও ইসরায়েলকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা।
হামাস যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ভবিষ্যৎ গাজা প্রশাসন থেকে তাদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল আবার পরিকল্পনাটিই প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই পরিস্থিতিতে কুশনারের হামাসের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর পরবর্তী বৈঠকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যদি ওয়াশিংটন হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও রাজনৈতিকভাবে গাজার প্রশাসন থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে রাজি করাতে পারে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চাপ দিতে পারে, তাহলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু ইসরায়েল পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের অবস্থানে থাকলে এবং গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখলে কুশনারের এই কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা সফল হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা চলতে থাকা অবস্থায় আলোচনার টেবিলে যুদ্ধবিরতির কাঠামো তৈরি করা যেমন কঠিন, তেমনি হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোও সহজ নয়।
তাই কুশনারের এই বৈঠককে আপাতত যুদ্ধের অবসানের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে নয়, বরং গাজা সংকটের একটি জটিল রাজনৈতিক সমাধানের পথে নতুন করে সরাসরি যোগাযোগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।