ঢাকা

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েনের কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি, ট্রাম্পের অসন্তোষ ও নীতিগত জটিলতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে তেহরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবকে ঘিরে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। সোমবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে পরিচিত মার্কিন ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইরানের প্রস্তাব: প্রণালি খোলা, কিন্তু পারমাণবিক ইস্যু অনুপস্থিত

নতুন প্রস্তাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ শিথিল করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ—এই প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি নিয়েই ওয়াশিংটনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্রের মতে, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রস্তাব গ্রহণে আগ্রহী নয়, যেখানে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত করা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে।

এর ফলে দুই দেশের আলোচনার গতি বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এবং কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

ট্রাম্পের অসন্তোষ: ‘বিজয়ী বর্ণনা’ নিয়েও উদ্বেগ

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত তিনটি কারণে নতুন প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট:

১. পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি নেই
২. যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চাপ শিথিলের শর্ত রয়েছে
৩. সম্ভাব্য চুক্তি রাজনৈতিকভাবে ‘বিজয়ী বর্ণনা’ তৈরি নাও করতে পারে

একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই প্রস্তাব মেনে নিলে ট্রাম্প প্রশাসনকে কূটনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে দেখা যেতে পারে—এটাই মূল রাজনৈতিক উদ্বেগ।”

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “গুজব বা অনানুষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে কোনো আলোচনা চালাবে না” এবং প্রেসিডেন্ট কেবল এমন চুক্তিই করবেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করে।

প্রশাসনের ভেতরে বিতর্ক: প্রণালি খোলা কি কৌশলগত জয়, নাকি পরাজয়?

ইরানের প্রস্তাবকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরে এখন স্পষ্ট দ্বিমত দেখা যাচ্ছে। একপক্ষ মনে করছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ কমবে এবং দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলবে।

অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ মনে করছে, পারমাণবিক ইস্যু বাদ দিয়ে কোনো সমঝোতা হলে তা কৌশলগতভাবে ইরানের জন্য সুবিধাজনক হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য—তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ন্ত্রণ—অর্জিত হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—ইরান কি আদৌ বড় কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত, নাকি এটি কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল।

হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। মার্কিন অবরোধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং হামলার আশঙ্কায় অনেক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট বেছে নিচ্ছে।

ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, কোনো চুক্তি হলে এই প্রণালি ব্যবহারের ওপর তাদের কর বা ফি আরোপের অধিকার থাকতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ চলাচলের নীতিকে সমর্থন করে আসছে, যা এই প্রস্তাবকে আরও জটিল করে তুলছে।

মার্কিন কৌশল: চাপ অব্যাহত রাখা নাকি আলোচনায় ফিরে যাওয়া?

মার্কিন প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, অবরোধ আরও দুই মাস চালিয়ে গেলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত তেহরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে পারে।

তবে অন্য অংশের মতে, ইরান বরং আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আলোচনার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করেছে।

মার্কিন মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত, ফলে নিম্নপর্যায়ের আলোচকদের পক্ষে বড় কোনো ছাড় দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও আঞ্চলিক চাপ

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পাকিস্তান, রাশিয়া, ওমানসহ একাধিক আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়েছেন। এসব আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।

তবে ওয়াশিংটন এখনো নিশ্চিত নয় যে, এই কূটনৈতিক তৎপরতা বাস্তব সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে নাকি কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেন, “ইরান একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ছাড় দিচ্ছে না। এই দ্বৈত অবস্থানই মূল সমস্যা।”

সামনে কী?

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা কয়েকটি বড় প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে—

ইরান কি পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমিত হলেও ছাড় দেবে?
হরমুজ প্রণালি খোলার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক শর্ত দেবে?
আঞ্চলিক শক্তিগুলো (পাকিস্তান, ওমান, সৌদি আরব) কতটা মধ্যস্থতা করতে পারবে?

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত কোনো পক্ষই পূর্ণ ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

একজন মার্কিন নীতি বিশ্লেষকের ভাষায়, “এটি এখন শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।”

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স