ঢাকা

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী উত্তাপ, ৬০ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ২ হাজার ছাড়াল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোট গ্রহণ বুধবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই দফায় কলকাতাসহ মোট সাত জেলার ১৪২টি আসনে ভোট হবে। জেলাগুলো হলো—পূর্ব বর্ধমান, নদীয়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং কলকাতা।

প্রথম দফার ভোট ২৩ এপ্রিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও শেষ দফাকে ঘিরে রাজ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরো অঞ্চলকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা হয়েছে।

৬০ ঘণ্টায় ব্যাপক গ্রেপ্তার: ২,৪৭৩ জন আটক

ভোটের মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে রাজ্যজুড়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মোট ২,৪৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি, অশান্তি উসকে দেওয়া এবং সম্ভাব্য সহিংসতার অভিযোগ ছিল।

নির্বাচন কমিশন মনে করছে, শেষ দফার ভোটের আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এই গ্রেপ্তার অভিযানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কও শুরু হয়েছে।

সাত জেলায় কড়া নিরাপত্তা বলয়

শেষ দফার ভোটকে কেন্দ্র করে কলকাতা ও আশপাশের সাত জেলাকে কার্যত ‘নিরাপত্তার চাদরে’ ঢেকে ফেলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ যৌথভাবে মোতায়েন রয়েছে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে। গুরুত্বপূর্ণ বুথ, সীমান্ত এলাকা এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত বাহিনী রাখা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না।

‘সিংঘম’ আইপিএসকে কেন্দ্র করে বিতর্ক

এবারের নির্বাচনে পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে উত্তর প্রদেশ ক্যাডারের আইপিএস কর্মকর্তা অজয় পাল শর্মাকে। অনেকে তাঁকে ‘সিংঘম’ নামে চেনেন। কঠোর আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি পরিচিত হলেও, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়েও অতীতে বিতর্কে ছিলেন।

মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনায় একটি নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে অজয় পাল শর্মা কড়া ভাষায় সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনে কেউ মাস্তানি করলে উত্তর প্রদেশের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস এই নিয়োগকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করে। দলটির সমর্থক আইনজীবীরা কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন। আদালত মামলা গ্রহণ করেছে এবং নির্বাচনের পর শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতা: মৃত্যু ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরার বাসিন্দা নগেন গিরি নামের এক ভোটার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এর আগে ২১ এপ্রিল দাঁতনে বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের সংঘর্ষে তিনি আহত হন।

এছাড়া ভাটপাড়া এলাকায় বিজেপির নির্বাচনী মিছিল চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন এক কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান, যিনি বিজেপি প্রার্থী পবন সিংয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। বিজেপির অভিযোগ, এই হামলার পেছনে তৃণমূলের দুর্বৃত্তরা জড়িত।

কেন্দ্রীয় তদন্তে নেমেছে এনআইএ

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ভারতীয় জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটি হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, সংগঠিত সহিংসতা এবং নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে।

রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ

শেষ দফার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। একদিকে বিজেপি শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে সহিংসতার জন্য দায়ী করছে, অন্যদিকে তৃণমূল অভিযোগ করছে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনের একাংশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে না।

নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জানিয়েছে, ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।

শেষ দফার ভোট: রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারণী মুহূর্ত

কলকাতা ও আশপাশের এই সাত জেলার ১৪২ আসনকে এবারের নির্বাচনের চূড়ান্ত নির্ধারক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দফার ফলাফলই রাজ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলবে।

একদিকে কঠোর নিরাপত্তা, অন্যদিকে অভিযোগ-সহিংসতা ও রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে শেষ দফার ভোট পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম উত্তপ্ত নির্বাচনী পর্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স