রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বাস্তবে শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে—এ প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি Mahmudur Rahman Manna। তিনি বলেছেন, “কার্ডভিত্তিক রাজনীতি” দিয়ে প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (তারিখ উল্লেখিত) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে Human Rights Support Society (HRSS)।
“কার্ডের রাজনীতি কতটা কার্যকর?”
আলোচনা সভায় মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশে বর্তমানে পরিবার কার্ড, শ্রমিক কার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। তবে এগুলো প্রকৃত অর্থে মানুষের কল্যাণে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার ভাষায়, “এটা কি সত্যি সত্যি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য হচ্ছে, নাকি কেবল নীতিগত ঘোষণা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ?”
তিনি আরও দাবি করেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যেসব পরিবার কার্ড পাওয়ার যোগ্য নয়—এমন প্রায় ১৫ শতাংশ পরিবারও এই সুবিধার আওতায় এসেছে।
মান্না বলেন, প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে হলে শুধু কার্ড বিতরণ নয়, বরং জনগণকে বাস্তব ও দৃশ্যমান সুবিধা দিতে হবে। “কোনো কার্ডের পলিটিকস নয়, জনগণকে কংক্রিট বেনিফিট দিতে হবে,” বলেন তিনি।
শ্রমিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য
অনুষ্ঠানে “বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতি: চ্যালেঞ্জ, অগ্রগতি ও করণীয়” শীর্ষক একটি মানপত্র উপস্থাপন করেন HRSS-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
তিনি সংগঠনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানান, ২০২৫ সালে শ্রমিক-সম্পর্কিত ২৬০টি ঘটনায় ৯৬ জন নিহত এবং ১,০২১ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু হয়েছে ১৬৮ জনের।
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই ১৩৯টি ঘটনায় ৩০ জন শ্রমিক নিহত এবং ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান। তার মতে, এ পরিসংখ্যান শ্রমিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশেষ করে মার্চ মাসে হতাহতের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে সমালোচনা
মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে বৈষম্য এখনো অত্যন্ত গভীর। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মালিকপক্ষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে কোটি টাকা ব্যয় করলেও অনেক শ্রমিক ঢাকায় ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাও পান না।
তিনি শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অবদান—গণ–আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন—উল্লেখ করে বলেন, শ্রমিকরা বারবার অবদান রাখলেও নীতিগতভাবে তারা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছেন।
শ্রমিক অধিকার ও রাজনীতি
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন Bangladesh Institute of Labour Studies (BILS)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকারকে উপেক্ষা করে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, মানবাধিকার আন্দোলনের মূলধারায় শ্রমিক অধিকার এখনো যথাযথভাবে স্থান পায়নি—যা বাস্তবতার একটি বড় ঘাটতি।
আলোচনা শেষে সাম্প্রতিক শ্রম আন্দোলনে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
শ্রমিক আন্দোলনের দীর্ঘ প্রেক্ষাপট
অনুষ্ঠানে সাবেক সংসদ সদস্য ও শ্রমিকনেতা শাহ মো. আবু জাফর বলেন, দেশে শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো অসংগঠিত, যার কারণে তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে কর্মজীবী নারীর উপপরিচালক রাবিতা ইসলাম পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
Bangladesh National Labour Federation-এর সভাপতি আবদুল কাদের হাওলাদার বলেন, ঐতিহাসিক আন্দোলন ও সংগ্রামে শ্রমিকদের অবদান থাকলেও বাস্তবে তারা বারবার অবহেলিত হয়েছেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা, যারা শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, মজুরি বৈষম্য হ্রাস এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
আলোচনা সভার বক্তারা একমত হন যে, শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত নীতিমালা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তব প্রয়োগে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। কার্ডভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং ন্যায্য মজুরি—এই তিনটি বিষয় ভবিষ্যৎ শ্রমনীতি নির্ধারণে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।