ঢাকা

সংসদে বিরোধী নেতার আহ্বান: অতীতকে সম্মান করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিস্তৃত রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির Shafiqur Rahman। তিনি সরকারি দলকে অতীত ইতিহাসে বেশি সময় ব্যয় না করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৃহস্পতিবার সংসদে প্রায় ৪৩ মিনিটের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “অতীতকে স্মরণ রাখা ভালো, ইতিহাস শিক্ষা ভালো। কিন্তু ইতিহাসকে নিয়ে পড়ে থাকলে আমরা নিজেরা ইতিহাস তৈরি করতে পারব না।” তিনি মনে করেন, সংসদের চলমান অধিবেশনের বড় অংশ জুড়ে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখে না।

সংসদীয় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সম্পর্ক

বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সংসদের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, সরকারি ও বিরোধী দলের ভূমিকা পাল্টে গেলেও আচরণগত পার্থক্য খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, অতীতে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত যেভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছিল, এখন ক্ষমতাসীনদের বক্তব্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দলগুলো একসঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই ঐক্য অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে গেছে।

সংবিধান ও রাজনৈতিক অবস্থান

সংবিধান প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত সংবিধান মানে বলেই সংসদে অংশ নিচ্ছে। তবে তিনি দাবি করেন, সংবিধানের বিভিন্ন অংশ নিয়ে তাদের ভিন্ন মত থাকতে পারে, যা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

তিনি বলেন, “সংবিধান না মানলে আমরা সংসদে আসতাম না। আমরা আইন মান্যকারী নাগরিক।”

তিনি আরও বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে তার দলীয় অবস্থান ভিন্ন হলেও এটি নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।

কৃষি, অবকাঠামো ও তিস্তা প্রকল্প

দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তার মতে, উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি অভিযোগ করেন, কৃষকেরা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ঢাকায় যেসব পণ্য বেশি দামে বিক্রি হয়, তার ন্যায্য অংশ কৃষকেরা পান না।

তিনি বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে। কোনো শক্তির প্রভাবে নয়, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত ন্যায়ের পক্ষে এবং মানবিক সংকটে আক্রান্তদের পাশে থাকা।

আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিস্থিতি

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ এখনো সমাজে বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষাঙ্গনেও সহিংসতা ও সংঘাতের ঘটনা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংসদীয় দায়িত্ব ও ঐক্যের আহ্বান

বক্তব্যের শেষ অংশে শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সংসদের দিকে শুধু দেশের জনগণ নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিরাও তাকিয়ে আছেন। তাই সংসদকে সফল করতে হলে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, “আমরা এখানে কোনো দলের নয়, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করি।”

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ

বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্যে একদিকে যেমন ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিতর্কের পুনরাবৃত্তি রয়েছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিও উঠে এসেছে। বিশেষ করে কৃষি, অবকাঠামো ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে এই বক্তব্য রাজনৈতিক সংলাপ, ঐতিহাসিক বিতর্ক এবং ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ নিয়ে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স