ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের এ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি (২৫ বিলিয়ন) ডলারে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কংগ্রেসে এই তথ্য উপস্থাপন করেন। এটি ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে পেন্টাগনের প্রথম আনুষ্ঠানিক হিসাব।
তবে সামরিক বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতাদের একাংশের মতে, বাস্তবে এই ব্যয় আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনা পুনর্গঠন, সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক ব্যয় এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।
যুদ্ধব্যয় নিয়ে কংগ্রেসে প্রথম আনুষ্ঠানিক তথ্য
পেন্টাগনের প্রধান হিসাবরক্ষক জুলস ‘জাই’ হার্স্ট হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে জানান, এই ব্যয়ের বড় অংশই গোলাবারুদ, অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের পেছনে খরচ হয়েছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেননি যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি বা পুনর্গঠন ব্যয় এই ২৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কি না।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা অ্যাডাম স্মিথ বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই হিসাব চেয়ে আসছিলাম। অবশেষে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও এটি এখনো অসম্পূর্ণ।”
প্রকৃত ব্যয় নিয়ে বিভ্রান্তি ও বাড়তি অনুমান
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় আরও অনেক বেশি হতে পারে। একটি পূর্ববর্তী অনুমানে মাত্র ছয় দিনেই প্রায় ১ হাজার ১৩০ কোটি (১১.৩ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ, রাডার সিস্টেম প্রতিস্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন ব্যয় যুক্ত হলে মোট ব্যয় সহজেই দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী চাপ
এই ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য এমন সময় প্রকাশিত হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, যার সঙ্গে ইরান যুদ্ধের ব্যয় যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা এই যুদ্ধকে জনজীবনের ব্যয় সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জন্য এটি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অবস্থান: “খরচ যৌক্তিক”
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যে লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, সেই তুলনায় এই ব্যয় “যৌক্তিক”।
তিনি প্রশ্ন করেন, “ইরান যেন পারমাণবিক বোমা না পায়, তা নিশ্চিত করতে আপনি কত মূল্য দিতে রাজি আছেন?”
হেগসেথ আরও দাবি করেন, এই অভিযান কোনো ‘চোরাবালি যুদ্ধ’ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য পদক্ষেপ। তিনি সমালোচনাকারী ডেমোক্র্যাটদের “অকর্মণ্য ও পরাজয় মানসিকতার” বলে অভিহিত করেন।
যুদ্ধের মানবিক ও সামরিক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং কয়েকশ’ আহত হয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। বর্তমানে দুই পক্ষ ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং অতিরিক্ত হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: জ্বালানির দাম ও মুদ্রাস্ফীতি
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বাজারে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কৃষিপণ্য ও সারসহ নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তুলছে, যা আসন্ন নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
জনমত ও রাজনৈতিক চাপ
রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৩৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধে জড়ানোর পক্ষে সমর্থন দিচ্ছেন। কয়েক মাস আগেও এই হার ছিল কিছুটা বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জনসমর্থন আরও কমে যেতে পারে, যা প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াবে।
ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। পেন্টাগনের দেওয়া ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের বাইরে প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।