ঢাকা

পরিবর্তিত শিক্ষাপদ্ধতিতে নোট-গাইড অচল হয়ে পড়ছে: শিক্ষামন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পরিবর্তনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচলিত নোট ও গাইড বইয়ের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই কমে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, শিক্ষা পদ্ধতি আধুনিকায়নের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্থনির্ভরতার বদলে বিশ্লেষণধর্মী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটছে। এ কারণে ভবিষ্যতে নোট-গাইড বইয়ের ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। তবে এর বিকল্প হিসেবে মানসম্মত সহায়ক বই বাজারে থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শুক্রবার রাজধানীর Bangla Academy-এর আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)-এর ৪৪তম বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘নোট-গাইড শিক্ষার স্থায়ী ব্যবস্থা নয়’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা এমন এক ধাপে পৌঁছেছে যেখানে শুধু তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করার সুযোগ ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।

তিনি বলেন, “শিক্ষাব্যবস্থা এমন দিকে ধাবিত হচ্ছে যে, আমার মনে হয় না নোট-গাইড ভবিষ্যতে শিক্ষার প্রচলিত কোনো ব্যবস্থা হিসেবে থাকবে। পৃথিবীজুড়েই এ ধরনের নির্ভরতা ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে।”

ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে গাইড বইয়ের নির্ভরতা কমবে

আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের হাতে ট্যাব, অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট ও ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রচলিত গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

তাঁর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বইয়ের বাইরেও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করছে এবং এতে শেখার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে।

প্রকাশকদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না

নোট-গাইডের ব্যবহার কমে গেলেও প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকাশকরা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত সহায়ক বই, অনুশীলন বই, রেফারেন্স বই ও আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা বাজারে আনতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তুলনামূলক কম খরচে বই মুদ্রণ ও প্রকাশ সম্ভব। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বই রপ্তানির সুযোগও রয়েছে।

অতীতে অনিয়মের ইঙ্গিত

বিগত সরকারের আমলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গাইড বই বিতরণে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের অনিয়মের পেছনে মূলত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাব ছিল।

শিক্ষায় বাড়বে বাজেট

বর্তমান সরকার শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে জানিয়ে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আগামী জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে। শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি সংযোজন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

বইমেলা পরিচালনায় বাপুস ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করার প্রস্তাব

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বই প্রকাশক ও বিক্রেতাদের সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক সীমিত হলেও অমর একুশে বইমেলার নেতৃত্বে এই দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি আগামী বছর থেকে বইমেলা ব্যবস্থাপনায় বাপুস এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন।

প্রকাশক-বিক্রেতাদের পাশে থাকার আশ্বাস

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকা বাংলাবাজার দেশের অন্যতম বৃহৎ বই প্রকাশনা ও বিপণন কেন্দ্র। বই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকাশক ও বিক্রেতাদের সার্বিক উন্নয়নে তিনি কাজ করবেন এবং তাঁদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকবেন।

প্রকাশনা শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার দাবি

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাপুসের সভাপতি মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্প দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। তিনি এ খাতকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান।

একই সঙ্গে তিনি আগামী ১ জানুয়ারির বই উৎসব সফল করতে কাগজের বাজারে সিন্ডিকেট ভেঙে ন্যায্যমূল্যে কাগজ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র প্রেসমালিক ও প্রকাশকদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার দাবিও জানান তিনি।

মুদ্রিত বইয়ের গুরুত্ব এখনও অপরিসীম

‘সমাজ জাগরণে প্রকাশক ও বিক্রেতাদের ভূমিকা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপুসের পরিচালক ও শিক্ষাবিদ মো. আবদুল আজিজ। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগেও মুদ্রিত বইয়ের গুরুত্ব অটুট রয়েছে। বই মানুষের মনোযোগ, গভীর চিন্তা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং একটি সচেতন জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি নীলক্ষেত ও বাংলাবাজারের বই বিক্রেতাদের নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরে এই পেশাকে আরও সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করার আহ্বান জানান।

পুরোনো আইন আধুনিকায়নের দাবি

বাপুসের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, ২০০৭ সালের পর থেকে প্রচলিত নোট-গাইড প্রথা কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত প্র্যাকটিস বুক ও সহায়ক বইয়ের জন্য ১৯৪০ সালের পুরোনো আইন আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার, বইয়ের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার, National Curriculum and Textbook Board (এনসিটিবি)-এর বই বিতরণে অনিয়ম বন্ধ এবং অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারির দাবি জানান।

শিক্ষা ও প্রকাশনা খাতে নতুন বাস্তবতা

সভায় বক্তারা বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই সময়োপযোগী সহায়ক বই, গবেষণাধর্মী প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বই প্রকাশের মাধ্যমে এ খাতের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থা হবে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষতাকেন্দ্রিক এবং সৃজনশীল। সেই বাস্তবতায় নোট-গাইডের প্রচলিত ধারা ক্রমে গুরুত্ব হারালেও মানসম্মত বই ও প্রকাশনার প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই কমবে না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স