রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ধারার দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও পেশাজীবী গোষ্ঠীর ৩৬ জন নেতা-কর্মী যোগ দিয়েছেন। গণ অধিকার পরিষদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স, আপ বাংলাদেশসহ একাধিক সংগঠনের নেতাদের এই যোগদানকে দলটির সাংগঠনিক বিস্তারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যুক্ত করা হয়। নাম ঘোষণা শেষে তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
বিভিন্ন সংগঠন থেকে আসা নতুন নেতৃত্ব
এদিন এনসিপিতে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠন ও ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।
নতুন যোগদানকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন—
আপ বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সেক্রেটারি নাকিবুর রহমান
জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের মিরপুর জোনের আহ্বায়ক চিকিৎসক আশিকুর রহমান
তুরাগ থানা গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল উদ্দিন খান
যুব অধিকার পরিষদের তুরাগ থানার সদস্যসচিব সাইয়েদ আহমদ শরীফ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তুরাগ থানার আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ খান
উত্তরখান থানার আহ্বায়ক আবদুর রহমান এবং সদস্যসচিব ফজলে রাব্বী
এ ছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী থেকে যুক্ত হয়েছেন আবদুল্লাহ আল রহমান, জাহিদ রেজা নূর, আরিফা বিনতে মাসুদ, করিম মিয়া, দিলশাদ ঊর্মি, শিবলী নোমান, নাজমুন নাহার, আবদুল্লাহ আল সাকিব, মো. ফাহিম, মিজানুর রহমান, আলী হাসান, জাকির হোসেন, মাইন উদ্দিন, তারেক মনোয়ার, সাইফুল ইসলাম ও জসীম উদ্দিনসহ আরও অনেকে। তাঁদের কেউ চিকিৎসক, কেউ চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসায়ী এবং কেউ বিভিন্ন বেসরকারি পেশার সঙ্গে যুক্ত।
‘নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য’—এনসিপির বক্তব্য
নতুন সদস্যদের পরিচয় প্রকাশ শেষে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গঠিত বিভিন্ন আহ্বায়ক কমিটি থেকে সংগঠিত নেতারা এখন দলীয়ভাবে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন,
“ঢাকা মহানগর উত্তরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৩টি আহ্বায়ক কমিটি ছিল। সেখান থেকে অনেক নেতা এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি আপ বাংলাদেশ, গণ অধিকার পরিষদ ও যুব অধিকার পরিষদের থানা পর্যায়ের নেতারাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আমরা সবাই মিলে নতুন বাংলাদেশ গঠনে কাজ করব।”
সংবাদ সম্মেলনের শেষে নতুন যোগদানকারীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন তিনি।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি
এই অনুষ্ঠানে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব শাহরীন ইরা, যুগ্ম সমন্বয়ক রাফিদ এম ভূঁইয়া, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আবদুল্লাহ আল মনসুরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নেতারা বলেন, দলটি সাংগঠনিকভাবে আরও বিস্তৃত হতে চায় এবং তরুণ নেতৃত্ব ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
এনসিপির সাংগঠনিক সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এনসিপি ধারাবাহিকভাবে সংগঠন সম্প্রসারণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৯ এপ্রিল এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৪৪ জন নেতা-কর্মী দলে যোগ দেন, যা ছিল এই প্রক্রিয়ার সূচনা।
এরপর ২৪ এপ্রিল বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল (ফ্লোরা), কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি এনসিপিতে যোগ দেন।
সবশেষে ৫ মে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমানসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি দলটিতে যুক্ত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এনসিপির এই ধারাবাহিক যোগদান প্রক্রিয়া দলটিকে দ্রুত সংগঠন বিস্তারের সুযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা ও পেশাজীবী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে দলটি একটি ‘মিশ্র রাজনৈতিক কাঠামো’ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এত বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী একত্রে টেকসই রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে কি না—তা সময়ের পরীক্ষায় নির্ধারিত হবে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, ছাত্র আন্দোলন ও পেশাজীবী মহল থেকে ৩৬ জনের এই যোগদান এনসিপির সাংগঠনিক সম্প্রসারণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দলটির লক্ষ্য এখন এই সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলা এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা।