ঢাকা

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এসআইআর ট্রাইব্যুনাল থেকে বিচারপতির পদত্যাগে বিতর্ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি টি এস সিভাগনানাম ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচন–সংক্রান্ত এই সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় তাঁর পদত্যাগ নতুন করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Indian Express–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপতি সিভাগনানাম ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তবে ঠিক কী কারণে তিনি দায়িত্ব ছাড়লেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের পরিবর্তন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১ হাজার ৬০৭ জন নাগরিকের আপিল মঞ্জুর করা হয়েছে এবং তাঁদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সিদ্ধান্ত এসেছে এসআইআর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গঠিত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে।

তবে এই সংখ্যাটি কেবল একটি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের অংশ। মোট ১৯টি ট্রাইব্যুনাল একই ধরনের আপিল নিষ্পত্তির কাজ করছিল। ফলে সামগ্রিকভাবে কত ভোটার পুনরায় তালিকাভুক্ত হয়েছেন বা কতজন ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছেন—সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি।

একটি ট্রাইব্যুনালের বিপুল সংখ্যক আপিল নিষ্পত্তি

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিচারপতি সিভাগনানামের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল ৫ এপ্রিল থেকে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে মোট ১ হাজার ৭৭৭টি আপিল নিষ্পত্তি করেন।

এর মধ্যে—

১ হাজার ৭১৭ জনের আপিল মঞ্জুর করা হয়
৬০টি আপিল খারিজ করা হয় (বীরভূম জেলার ক্ষেত্রে)

অর্থাৎ, প্রায় ৯৬ শতাংশের বেশি আপিল গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়, যা নিয়েও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যাচাই–বাছাই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভোটার তালিকা সংশোধনে আদালতের নজরদারি

এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা। আদালত ভোটার তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্ব জেলা ও দায়রা জজ পর্যায়ের বিচারিক কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত করে। নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের মধ্যে আস্থার ঘাটতির কারণেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানা যায়।

প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের তথ্য সফটওয়্যার–ভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে অসঙ্গতিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে সাত শতাধিক বিচারিক কর্মকর্তা যাচাই করে প্রায় ২৭ লাখ ১৬ হাজার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেন।

১৯ ট্রাইব্যুনাল ও বড় পরিসরের আপিল প্রক্রিয়া

পরবর্তী সময়ে আপিল নিষ্পত্তির জন্য ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, যেখানে অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতিরা দায়িত্ব পালন করেন। এই ট্রাইব্যুনালগুলোর মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শুরু হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু একটি ট্রাইব্যুনালই কয়েক হাজার আপিল নিষ্পত্তি করেছে। ফলে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ নির্দেশনা ও সময়সীমা

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা দেয়। আদালত জানায়—ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তিরা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

এই নির্দেশনার ফলে নির্বাচন চলাকালীন সময়েও ভোটার তালিকায় পরিবর্তন আনা হয়, যা নির্বাচনী প্রশাসনে বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

আলোচিত প্রার্থীর ভোটার তালিকায় পুনঃঅন্তর্ভুক্তি

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কংগ্রেস প্রার্থী মোতাব শেখের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লেও তিনি আপিলের মাধ্যমে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হন। পরে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং ফরাক্কা আসনে নির্বাচিত হন।

ট্রাইব্যুনাল জানায়, তাঁর পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে পাসপোর্টসহ একাধিক নথি উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা পূর্ববর্তী যাচাই প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

পদত্যাগ ঘিরে প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা

বিচারপতি সিভাগনানামের পদত্যাগের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত গুরুত্বপূর্ণ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার মাঝপথে কেন তিনি দায়িত্ব ছাড়লেন?

নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে The Indian Express।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় এত বড় সংখ্যক আপিল গ্রহণ, বিপুল সংখ্যক নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তি এবং একজন ট্রাইব্যুনাল প্রধানের পদত্যাগ—সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে নির্বাচনের সময় ভোটার তালিকায় ধারাবাহিক পরিবর্তন প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রশ্ন তুলছে।


পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর ট্রাইব্যুনাল ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং একটি বৃহৎ নির্বাচনী ও রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। বিচারপতির পদত্যাগ সেই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে।

ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ভারসাম্য এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা—সবকিছুই এখন নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স