এক দশক আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক ‘হামমুক্ত’ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া জাপান-এ আবারও হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে চলতি বছরে হামের রোগী সংখ্যা ইতোমধ্যে ৪০০ ছাড়িয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ সংক্রমণ পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাপানের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে গণমাধ্যম NHK জানিয়েছে, এ বছরের প্রথমার্ধেই ৪৩৬ জনের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৭৪৪ জন আক্রান্ত হয়েছিল। যদিও এবার এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
সংক্রমণের কেন্দ্র টোকিও ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের রাজধানী টোকিও এবং এর আশপাশের তিনটি প্রিফেকচারে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। এই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ১৮৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা মোট আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক।
এর বাইরে কয়েকটি প্রিফেকচারে ‘ক্লাস্টার সংক্রমণ’ বা গুচ্ছ আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যা ভাইরাসটির স্থানীয় বিস্তার বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিদেশফেরত ও পর্যটকদের মাধ্যমে সংক্রমণের সন্দেহ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জাপানে সাম্প্রতিক হামের সংক্রমণের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে এসেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে ভাইরাসটি প্রবেশ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে নিউজিল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া থেকে সংক্রমণের উৎস শনাক্ত করা হলেও পরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। জাপানের সংবাদমাধ্যম Mainichi Shimbun জানিয়েছে, বিদেশফেরত ব্যক্তি ও পর্যটকদের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি।
টিকাদান কাভারেজ হ্রাসই বড় কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো টিকাদানের হার কমে যাওয়া। জাপানে বর্তমানে হামের টিকাদান কর্মসূচি দুই ডোজভিত্তিক।
প্রথম ডোজ: ১ বছর বয়সে
দ্বিতীয় ডোজ: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের আগে
২০০৬ সাল থেকে এই দুই ডোজ ব্যবস্থা চালু হয়। দ্বিতীয় ডোজের কার্যকারিতা হামের বিরুদ্ধে প্রায় ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ সুরক্ষা দেয় বলে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
তবে টিকা গ্রহণের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমে গেছে। বিশেষ করে কোভিড–১৯ মহামারির পর দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে বলে জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
‘হামমুক্ত’ ঘোষণার পরও কেন পুনরায় সংক্রমণ?
২০১৫ সালে জাপানকে ‘হামমুক্ত দেশ’ ঘোষণা করে World Health Organization। তখন দেশটি উচ্চ টিকাদান কাভারেজ এবং কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থার কারণে এই স্বীকৃতি অর্জন করে।
তবে বর্তমানে কয়েকটি কারণ মিলিয়ে পরিস্থিতি বদলে গেছে—
টিকাদানের হার ধীরে ধীরে কমে যাওয়া
কোভিড–১৯ পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়া
দীর্ঘ সময় সংক্রমণ না থাকায় গোষ্ঠীগত রোগপ্রতিরোধ (herd immunity) দুর্বল হয়ে পড়া
বিদেশফেরত সংক্রমণ বৃদ্ধি
বয়স্কদের মধ্যে বেশি উদ্বেগ
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে শিশুদের মধ্যে হাম বেশি দেখা গেলেও জাপানে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বয়স্করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে টিকার কার্যকারিতা কিছুটা কমে যেতে পারে, যা ঝুঁকি বাড়ায়।
এ কারণে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুনরায় টিকাদান বা বুস্টার ডোজ বিবেচনার পরামর্শ দিচ্ছেন।
টিকা গ্রহণে আগ্রহ বাড়লেও বাধা ব্যয়
হামের সংক্রমণ বাড়ার পর জাপানে টিকাদান কেন্দ্রে ভিড়ও বেড়েছে। তবে নিয়মিত শিশুদের টিকা সরকারি ব্যবস্থায় বিনামূল্যে দেওয়া হলেও বয়স্ক বা অনিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির জন্য অনেক ক্ষেত্রে খরচ নিজেদের বহন করতে হয়।
মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ব্যয় অনেককে টিকা নিতে নিরুৎসাহিত করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: সাময়িক বিনামূল্যে টিকা জরুরি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সাময়িকভাবে কোভিড–১৯ টিকার মতো সরকারি অর্থায়নে হামের টিকাদান কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন হতে পারে।
তাঁদের মতে, দ্রুত টিকাদান কাভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে না নিতে পারলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এক সময় সফলভাবে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বে উদাহরণ তৈরি করা জাপান এখন আবার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও টিকাদান হ্রাস, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার পরিবর্তন—সব মিলিয়ে দেশটিতে হাম আবারও জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও সমন্বিত টিকাদান ব্যবস্থা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।