ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির দিকে যাচ্ছে, নাকি নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
আল–জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক একদিকে কূটনৈতিক আলোচনায় এগোলেও, অন্যদিকে একাধিক সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি সংঘাত
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষই একাধিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার হামলা ও পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে। ফলে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে সেসব ঘাঁটি ইরানের বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
সমুদ্রপথ ও উপসাগরীয় উত্তেজনা
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, দেশটির নৌবাহিনী ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ তৈরি করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং ইরানের সামরিক তৎপরতাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
একাধিক অঞ্চলে হামলার অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে হামলা-পাল্টা হামলার খবর সামনে এসেছে। কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কেন্দ্র করে একাধিক ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার দাবি করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং বড় কোনো মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
এছাড়া বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটি ও বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ উঠলেও তা সফল হয়নি বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অবস্থান: আলোচনার পাশাপাশি প্রস্তুতিও
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, ইরান চুক্তি না করলে “বড় ধরনের বোমাবর্ষণ” শুরু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হয়, তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
ইরানের কূটনৈতিক বার্তা ও সামরিক সতর্কতা
অন্যদিকে ইরান একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিতও দিচ্ছে। ইরানের দাবি, দেশটি শান্তিচুক্তির পক্ষে থাকলেও আক্রমণের মুখে আত্মরক্ষার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানের নৌবাহিনী সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
কূটনৈতিক অগ্রগতি নাকি অস্থিরতা?
গত কয়েক মাসে একাধিকবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনা সামনে এসেছে। তবে কোনো চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই আলোচনার টেবিলে থাকলেও বাস্তবে সামরিক প্রস্তুতি এবং আক্রমণ–প্রতিরোধের সক্ষমতা একই সঙ্গে বাড়াচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও অনিশ্চয়তা
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে। তেল সরবরাহ, বাণিজ্যিক নৌ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কি স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্ভব হবে, নাকি সীমিত সংঘাত ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে গড়াবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ এই সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে।