বাংলাদেশে বর্তমানে যে হাম সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, তা নতুন কোনো ধরন নয় বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। দেশের দুটি শীর্ষ স্বাস্থ্য গবেষণাগারে করা জিনগত বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বি৩ ধরনের হাম ভাইরাসই সক্রিয় রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও, হাম ও রুবেলা ল্যাবরেটরি এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরীক্ষায় একই ফল পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ভাইরাস বিদেশ থেকে আসেনি; বহু বছর ধরেই এটি দেশে বিদ্যমান।
এদিকে হামে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উপসর্গ ও পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া রোগী মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৬০০ অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টাতেই আরও সাতজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও যেসব শিশুর ল্যাব পরীক্ষায় রোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তাদের অনেকের মৃত্যুর পেছনেও হামই দায়ী। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহিদ রায়হান জানান, দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় সংক্রমণ কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, সংক্রমণ কমলে মৃত্যুও ধীরে ধীরে কমে আসবে। পাশাপাশি মৌসুমি নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য রোগেও শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তাই সব মৃত্যুকেই হামজনিত বলা ঠিক হবে না।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষভাগ এবং ২০২৬ সালের শুরুতে সংগৃহীত নমুনার জিন বিশ্লেষণে বি৩ ধরনের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত পরীক্ষাগারগুলো নিয়মিত এ তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাঠিয়ে থাকে।
বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত হামের ২৪টি জিনগত ধরন শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে বি৩ ধরনটিই সবচেয়ে বেশি দেখা গেলেও অতীতে সীমিত আকারে ডি৮ ধরনের উপস্থিতিও পাওয়া গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলোতে আবারও বি৩ ধরনের আধিপত্য নিশ্চিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে সংক্রমণ স্থানীয়ভাবেই বিস্তার লাভ করেছে। তাই রোহিঙ্গা শিবির থেকে হাম ছড়িয়ে পড়ার যে ধারণা মাঝে মাঝে সামনে আসে, তা বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও মৃত্যুহার প্রত্যাশিতভাবে কমছে না। হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কান ও চোখের জটিলতা দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ ওয়ার্ড চালু, অতিরিক্ত ভেন্টিলেটর সরবরাহ এবং নির্দিষ্ট চিকিৎসা কেন্দ্র চালুর পরও মৃত্যুর মিছিল পুরোপুরি থামানো যায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, প্রাদুর্ভাবের শুরুতে রোগ ব্যবস্থাপনায় কিছু দুর্বলতা ছিল, যার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। তাঁদের অভিমত, এ ধরনের বড় স্বাস্থ্য সংকটকে আরও অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করা প্রয়োজন ছিল।