অনলাইনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে চীনা গোয়েন্দারা—এমন অভিযোগ তুলে নতুন করে বড় ধরনের সতর্কবার্তা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দা জোট Five Eyes।
গত বুধবার প্রকাশিত এই যৌথ বুলেটিনে বলা হয়েছে, পেশাদার নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য, গবেষক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের টার্গেট করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য—পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক কৌশল সংক্রান্ত গোপন তথ্য সংগ্রহ করা।
বুলেটিনটির নাম দেওয়া হয়েছে “Safeguarding Our Secrets”। এতে বলা হয়, এই ধরনের কার্যক্রম বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থিত কৌশলগত গুপ্তচর নেটওয়ার্কের অংশ।
সরকারি ও সামরিক ব্যক্তিরাই প্রধান লক্ষ্য
সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষভাবে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এই অভিযানের মূল টার্গেট। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দায়িত্ব পালনরত সামরিক কর্মকর্তারাও এর মধ্যে রয়েছেন।
এ ছাড়া সাংবাদিক, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং থিঙ্কট্যাংক গবেষকদেরও সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এসব পেশার মানুষরা নীতি নির্ধারণ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অনলাইনে ‘ভুয়া চাকরি’ ও অর্থের প্রলোভন
বুলেটিনে বলা হয়েছে, চীনা গোয়েন্দারা প্রথমে অনলাইনে আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাব দেয়। পেশাদার নেটওয়ার্কিং সাইট ব্যবহার করে তারা লক্ষ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং উচ্চ বেতনের কনসালট্যান্সি বা গবেষণা-সংক্রান্ত কাজের প্রস্তাব দেয়।
পরবর্তী ধাপে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করে স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তথ্যের বিনিময়ে কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। তথ্য যত সংবেদনশীল, আর্থিক প্রলোভন তত বেশি হয়।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে ধীরে ধীরে সম্পর্ক তৈরি করে তথ্য সংগ্রহের একটি আধুনিক “হাইব্রিড গুপ্তচর কৌশল”।
চীনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
এই প্রথম নয়, এর আগেও একাধিক পশ্চিমা দেশ পৃথকভাবে চীনের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলেছে। তবে এবারই প্রথম Five Eyes অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি দেশ একযোগে সমন্বিত সতর্কবার্তা প্রকাশ করল।
বেইজিং বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। চীন এগুলোকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” এবং “ভিত্তিহীন অপবাদ” বলে দাবি করে থাকে।
কৌশলগত লক্ষ্য: বৈশ্বিক তথ্য প্রবাহে প্রবেশ
বুলেটিনে আরও বলা হয়েছে, চীনের মূল উদ্দেশ্য হলো উচ্চপর্যায়ের সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করা। এই তথ্যের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর যুগে গুপ্তচরবৃত্তির ধরনও বদলেছে। এখন আর শুধু মাঠপর্যায়ের এজেন্ট নয়, বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক নেটওয়ার্কই প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
আগের সতর্কবার্তা ও গোয়েন্দা মূল্যায়ন
এর আগে ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা MI5 সংসদীয় পর্যায়েও চীনা গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে সতর্ক করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রও সরকারি ও সাবেক কর্মকর্তাদের অনলাইনে অপরিচিত চাকরির প্রস্তাবের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছে।
নতুন এই যৌথ বুলেটিনে বলা হয়েছে, এই ধরনের কার্যক্রম শুধু তথ্য চুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে নীতিনির্ধারণ ও নিরাপত্তা কাঠামো প্রভাবিত করার সক্ষমতাও রাখে।
পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, এই সতর্কবার্তা পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। কারণ, এখন তথ্য সংগ্রহের জন্য সীমান্ত অতিক্রমের প্রয়োজন না থাকলেও অনলাইন মাধ্যমেই বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা সম্ভব।
ফলে সরকারি ও সামরিক সংস্থাগুলোকে এখন কেবল ভৌত নিরাপত্তাই নয়, বরং ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ সুরক্ষার দিকেও সমানভাবে মনোযোগ দিতে হচ্ছে।
‘ফাইভ আইজ’-এর এই নতুন সতর্কবার্তা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আধুনিক ভূরাজনীতিতে গুপ্তচরবৃত্তি আর প্রচলিত সীমার মধ্যে নেই। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, চাকরির প্রলোভন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের আড়ালে রাষ্ট্রীয় তথ্য সংগ্রহ এখন আরও জটিল ও সূক্ষ্ম রূপ নিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান এই ডিজিটাল গুপ্তচর প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।