আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাংবাদিক পরিচয়ে যেসব ব্যক্তি বা গণমাধ্যম গণহত্যা, ভোট চুরি, গুম, খুন ও ব্যাংক লুটসহ বিভিন্ন অনিয়মকে ‘বৈধতা’ দিয়েছে বা জনমত গঠনের মাধ্যমে তা গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে—তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
আজ রোববার জাতীয় সংসদের সম্পূরক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান।
‘আইনের বাইরে কেউ নয়’—তথ্য প্রতিমন্ত্রীর জবাব
হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা চাকরিজীবী—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। কেউ যদি আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে প্রচলিত আইনের আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকলেও গণতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপ, সহিংসতা বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।
‘সম্মতি উৎপাদনকারী গণমাধ্যম’ নিয়ে কঠোর মন্তব্য
সম্পূরক প্রশ্নে বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে একপেশেভাবে উপস্থাপন করেছে এবং গণহত্যা, ভোট জালিয়াতি, গুম ও খুনকে বৈধতা দেওয়ার মতো ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের সময় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে যারা গণহত্যা, ভোট চুরি, গুম, খুন ও ব্যাংক ডাকাতির বৈধতা উৎপাদন করেছে, তাদের অনেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতে কিছু গণমাধ্যম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে “দেশদ্রোহী” বা “ষড়যন্ত্রকারী” হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং এর মাধ্যমে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে।
গণমাধ্যমে পুনর্বাসন ও প্রভাব নিয়ে অভিযোগ
হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, বিতর্কিত কিছু সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী আবারও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুনর্বাসিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে কিছু টেলিভিশন ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক ভূমিকা রাখছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, কিছু গণমাধ্যম নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করে সংবাদ পরিবেশন করছে, যা জনমত প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
সরকারের অবস্থান: “আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে”
এর জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংবিধানস্বীকৃত হলেও কেউ যদি গণতন্ত্রবিরোধী বা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত হন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন,
“যে কেউ আইন ভঙ্গ করলে সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অনিবন্ধিত সাংবাদিক ও অপতথ্য নিয়ে উদ্বেগ
সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক সম্পূরক প্রশ্নে অভিযোগ করেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অনেক অনিবন্ধিত ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন।
তিনি এসব বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।
এর জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন মোকাবিলায় কাজ করছে। একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কাজ করছে।
অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান–এর প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, অনলাইন পোর্টাল ও ডিজিটাল গণমাধ্যম অনুমোদনের জন্য একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই নীতিমালার ভিত্তিতেই সব অনলাইন মিডিয়া ও পোর্টালের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা নিয়ে তথ্য
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার মনির–এর লিখিত প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, ঢাকা থেকে বর্তমানে ৫৮৫টি দৈনিক পত্রিকা, ৩৬৩টি সাপ্তাহিক এবং ২৯৬টি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।
এর মধ্যে সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত দৈনিক ২৮৮টি, সাপ্তাহিক ৫৬টি এবং মাসিক ২৩টি পত্রিকা রয়েছে বলে তিনি জানান।
উপসংহার: গণমাধ্যম স্বাধীনতা বনাম জবাবদিহির বিতর্ক
সংসদে আলোচনায় একদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও, অন্যদিকে অপতথ্য, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং অনিবন্ধিত সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠে আসে।
ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে সংসদে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত।