গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে আর সহযোগিতা করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সরকার যদি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না করে, তাহলে তাদের পক্ষে পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।
শনিবার (২৬ জুলাই) বিকেলে সিলেট নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ১১-দলীয় ঐক্য আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যায় জড়িত শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বিচার’ দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। এ ছাড়া ১১-দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য দেন।
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে পাঁচ বছর টিকতে পারবে না সরকার’
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, বর্তমান সরকার সেই জনমত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ তারা সম্পন্ন করে যেতে পারবে না। জনগণের রায় উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বার্তা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পাঁচ বছর সরকার পরিচালনা করতে চান, নাকি জনগণের রায় অগ্রাহ্য করার পরিণতি ভোগ করতে চান।
তাঁর ভাষায়, জনগণের মতামত উপেক্ষা করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে, বাংলাদেশেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ করা হচ্ছে’
সমাবেশে বিএনপির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের অভিযোগও তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ও পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তা সম্ভব না হলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ করা উচিত।
‘সংস্কার নয়, শুধু সংশোধনের পথে হাঁটছে সরকার’
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে নতুন করে ‘সংস্কার বনাম সংশোধন’ বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে, যদিও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল।
তাঁর দাবি, কেবল সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, দেশের মৌলিক সংস্কারের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ অথবা গণপরিষদের প্রয়োজন হবে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি আগে এ বিষয়ে সম্মত হলেও সরকার গঠনের পর সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার থাকলেও এখন তারা শুধু সংশোধনের কথা বলছে।
‘জুলাই বিপ্লব ভুলে গেলে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে’
নাহিদ ইসলাম বলেন, যদি সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন এবং আন্দোলনে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগকে উপেক্ষা করে, তাহলে তার রাজনৈতিক পরিণতি সরকার ও বিএনপিকে বহন করতে হবে।
তাঁর ভাষায়, জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না হলে জনগণই তার জবাব দেবে।
ভারতের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন
বক্তব্যে ভারতের চলমান ছাত্র আন্দোলনেরও উল্লেখ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এ ঘটনাকে জনগণের আন্দোলনের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ভারতের আন্দোলনরত ছাত্র-তরুণদের অভিনন্দন ও সংহতি জানান।
অর্থনৈতিক সংকট নিয়েও সমালোচনা
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তাঁর দাবি, সবজির দাম দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন বাজেটে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর করের চাপ বাড়ানো হয়েছে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার না করায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সরকার প্রত্যাশিতভাবে পাচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক সংস্কার ও বিচার দাবিতে সমাবেশ
১১-দলীয় ঐক্যের আয়োজিত এই সমাবেশে বক্তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচার, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি জানান। পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনাও করেন তারা।