ঢাকা

যৌন অসদাচরণের অভিযোগের ছায়ায় আইসিসি প্রধানের পদ হারালেন করিম খান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যৌন অসদাচরণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে অপসারণের পক্ষে ভোট দিয়েছে আদালতের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পরিষদ অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিজ (এএসপি)। তবে তাঁর আইনজীবীরা এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং প্রক্রিয়াগতভাবে অন্যায্য বলে দাবি করেছেন।

করিম খানকে অপসারণের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন তিনি গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনার মুখে ছিলেন। ফলে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অপসারণ

অভিযোগ ওঠার প্রায় দুই বছর পর আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলো করিম খানকে অপসারণের অনুমোদন দেয়। ৫৬ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ ব্যারিস্টার গত জুনে নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পরিষদের একটি তদারকি প্যানেল তাঁর বিরুদ্ধে ‘গুরুতর অসদাচরণ’-এর অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।

এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার অনুষ্ঠিত ভোটে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আইসিসি জানিয়েছে, নতুন প্রধান কৌঁসুলি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত উপপ্রধান কৌঁসুলি নজহাত শামিন খান ও মামে মান্দিয়ায়ে নিয়াং যৌথভাবে দপ্তরের দায়িত্ব পালন করবেন।

জাতিসংঘের তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি

তবে করিম খানের আইনি দল বলছে, এই সিদ্ধান্ত স্বাধীন তদন্তের ফলাফলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তাঁর আইনজীবী তায়াব আলী জানান, জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর ওআইওএস (Office of Internal Oversight Services)–এর তদন্তে করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণ বা দায়িত্বে অবহেলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, একটি স্বাধীন বিচারিক প্যানেলও সর্বসম্মতিক্রমে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই মূল্যায়ন উপেক্ষা করেই তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে।

তায়াব আলীর ভাষায়, করিম খানকে এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে, যেখানে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং স্বাধীন বিচারকদের মূল্যায়নও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

‘শুধু করিম খান নন, ঝুঁকিতে আদালতের স্বাধীনতাও’

করিম খানের আইনজীবীরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তায়াব আলী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের এমন রাজনৈতিক বা আইনগতভাবে বিতর্কিত অপসারণ প্রক্রিয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়া উচিত।

তাঁর মতে, যখন আদালত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপের মুখে এবং করিম খান নিজেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁকে ভোটের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। এতে আদালতের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ কী?

করিম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন আইসিসির একজন নারী কর্মকর্তা, যার পরিচয় গোপন রেখে তাঁকে ‘সারাহ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই নারী অভিযোগ করেন, করিম খানের আচরণ ধীরে ধীরে আরও স্পর্শকাতর ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

তিনি দাবি করেন, এক পর্যায়ে তিনি ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকাকালে করিম খান তাঁর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়েছিলেন।

তবে করিম খান শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, অভিযোগগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল ন্যায্য বিচারনীতির পরিপন্থী।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের পর থেকেই বাড়ে চাপ

করিম খান আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে ইউক্রেন, সুদান, লিবিয়া ও গাজাসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত নিয়ে তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

তবে ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

পরে আইসিসির বিচারকেরা ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুমোদন করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আদালতের বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন করিম খানসহ আইসিসির একাধিক কর্মকর্তা ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

‘আইসিসির বিরুদ্ধে বৃহত্তর আক্রমণের অংশ’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল করিম খানের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে দেখছেন।

একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, করিম খানের বিরুদ্ধে এই মামলা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে পরিচালিত বৃহত্তর আক্রমণের অংশ।

তাঁর মতে, আদালতের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের সক্ষমতা দুর্বল করার জন্যই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

সামনে কী?

করিম খানকে অপসারণের মধ্য দিয়ে আইসিসির নতুন প্রধান কৌঁসুলি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে আগামী বছরের আগে নতুন কৌঁসুলি নির্বাচনের ভোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, করিম খানের অপসারণের ফলে আইসিসির প্রশাসনিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও নেতানিয়াহু ও ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ওপর এর কোনো তাৎক্ষণিক আইনি প্রভাব পড়বে না। কারণ, সেই পরোয়ানা বাতিল বা প্রত্যাহারের ক্ষমতা কেবল আইসিসির বিচারকদের হাতে রয়েছে।

তবে এই ঘটনার পর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আইসিসির তদন্ত ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আবারও প্রকাশ্যে সমালোচনা শুরু করেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বৈশ্বিক বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স