বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ আবদুল করিম খান, যিনি দর্শকের কাছে ‘করিম চাচা’ নামে পরিচিত ছিলেন, ২০০৯ সালের ২২ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি শত শত চলচ্চিত্রে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় কাজ ছিল মাটির ময়না চলচ্চিত্রে।
তারেক মাসুদ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে করিম চাচা প্রথমবারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। দীর্ঘদিন এফডিসিতে ‘এক্সট্রা’ শিল্পী হিসেবে কাজ করলেও এমন সুযোগ তিনি আগে কখনো পাননি। পরিচালক নিজেই এক স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, করিম চাচা এই সুযোগ পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।
‘মাটির ময়না’ ছিল তাঁর জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা
শুটিংয়ের প্রথম দিন করিম চাচা কোট-টাই ও হ্যাট পরে ইউনিটে হাজির হন। তিনি ভেবেছিলেন, জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটিকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রাখবেন। পরে তাঁকে নাপিতের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়, যার জন্য আলাদা প্রস্তুতির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
তারেক মাসুদের ভাই নাহিদ মাসুদ জানান, করিম চাচা পুরো শুটিংজুড়ে অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। একটি মনে রাখার মতো চরিত্রে অভিনয় করার স্বপ্ন তিনি এই চলচ্চিত্রেই পূরণ করতে পেরেছিলেন।
সিলেট থেকে ঢাকায়, তারপর চলচ্চিত্রে
মুক্তিযুদ্ধের আগে করিম চাচা সিলেট থেকে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় আসেন। যুদ্ধের সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের হারান। পরে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বসতি গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকেই শুটিংয়ে যেতেন।
তাঁর স্ত্রী হেনা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, করিম চাচা প্রথমে একটি পত্রিকা অফিসে চাকরি করতেন। মঞ্চনাটক ও যাত্রাপালার মাধ্যমে অভিনয়ে যুক্ত হয়ে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রে নাম লেখান। সততা ও অভিনয়দক্ষতার কারণে পরিচালক-প্রযোজকদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয়।
মাটির ময়না, প্রেমের অহংকার, অধিকার চাই, সৎ মানুষ ও ভুলো না আমায়সহ তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন।
অল্প পারিশ্রমিকেই সংসার
জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে করিম চাচার পারিশ্রমিক ছিল খুবই কম। কখনো এক হাজার, কখনো দুই হাজার টাকা পেতেন তিনি। সেই সামান্য আয় দিয়েই সংসার চালাতেন, সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন এবং কাপাসিয়ায় জমিও কিনেছিলেন।
‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের প্রধান সহকারী পরিচালক আক্তার হোসেন জানান, ওই চলচ্চিত্রে করিম চাচাকে প্রতিদিন এক হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো।
শেষ শুটিং ও মৃত্যু
২০০৯ সালে করিম চাচার একটি শুটিং ছিল কক্সবাজারে। সেখানে গিয়ে তিনি ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। শুটিং শেষে ঢাকায় ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং কিছুটা সুস্থ হয়ে কাপাসিয়ার বাড়িতে যান।
কিন্তু কয়েকদিন পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০০৯ সালের ২২ জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির তথ্যমতে, তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৩০ সালে।
বাংলা চলচ্চিত্রে হয়তো তিনি কখনো নায়ক ছিলেন না, কিন্তু ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন ‘করিম চাচা’ নামেই।