মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারির পর টানা ১৩তম রাতের মতো ইরানে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ অভিযানে ইরানের সামরিক ও নৌ সক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আহভাজ শহরের কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
শুক্রবার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম সর্বশেষ অভিযানের তথ্য প্রকাশ করে। এ খবর জানিয়েছে আল–জাজিরা।
সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিযানে ইরানের—
সামরিক কমান্ড সেন্টার,
ড্রোন সংরক্ষণাগার,
সামরিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক,
উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং
নৌ সক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যেন আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে।
সেন্টকম দাবি করেছে, আইআরজিসির সাম্প্রতিক হামলা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করছে।
তবে আইআরজিসি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই রয়েছে। তাদের মতে, ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া ওই জলপথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আহভাজে নিহত ৪, আহত আরও ৫
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, খুজেস্তান প্রদেশের রাজধানী আহভাজ শহরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন।
প্রদেশের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, হামলায় আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তবে নিহতদের পরিচয় কিংবা তাঁরা সামরিক না বেসামরিক—এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণ
তেহরান থেকে আল–জাজিরার সংবাদদাতা জানিয়েছেন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এ ছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের রাজধানী আহভাজেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা মেহের জানিয়েছে, খুজেস্তানের আন্দিমেশক ও ওমিদিয়েহ শহরেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।
অন্যদিকে আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন হামলায় অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারির পর হামলা
সর্বশেষ এই সামরিক অভিযান এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারির পর।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত চালানো সব হামলার চেয়েও বড় একটি সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও ব্যাপক ও শক্তিশালী সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কুয়েতে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারকে লক্ষ্য করে হামলাসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলার পর ওয়াশিংটন সামরিক চাপ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, টানা ১৩ দিন ধরে চলা এই হামলা-পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে সংঘাত নিরসনে এখনো কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং উভয় পক্ষের সামরিক অবস্থান আরও কঠোর হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।