গণভোটের বৈধতা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যদি গণভোটকে অবৈধ বলা হয়, তাহলে একই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনকে কীভাবে বৈধ বলা হয়—সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, “কী চমৎকার যুক্তি! একই ডেকচিতে গোশত পাকানো হয়েছে। গোশতের ঝোল হলো হারাম, আর গোশত হলো হালাল। কী আশ্চর্য ব্যাপার! হারাম হলে তো দুটোই হারাম। হালাল হলে দুটোই হালাল। যদি গণভোট হারাম হয়, তাহলে সংসদ নির্বাচনও হারাম। আর সংসদ নির্বাচন হারাম হলে এখন এই দেশে কোনো সরকার নেই।”
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরসংলগ্ন ফলপট্টি এলাকায় আয়োজিত এক জনসভায় এসব কথা বলেন তিনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তর।
‘গণভোটের রায়কে অসম্মান করা উচিত নয়’
জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিয়ে নিজেদের মতামত দিয়েছেন। তাই জনগণের সেই রায়কে অস্বীকার বা অবমূল্যায়ন করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
তিনি বলেন, “দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেছে। নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই জনগণকে গণভোটে অংশ নিতে এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমরাও একই আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এখন বলা হচ্ছে, গণভোট অবৈধ।”
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের রায়কে অবমাননা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তাঁর ভাষায়, “মেহেরবানি করে জনগণের রায়কে অপমান করবেন না। ইতিহাসে যারা জনগণের রায়কে অসম্মান করেছে, তাদের কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। দেরি হলেও জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নিন।”
‘সংসদে লড়াই চলবে’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তাঁদের রাজনৈতিক সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, জনগণের মুক্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং ফ্যাসিবাদের শেষ চিহ্ন বাংলাদেশ থেকে বিদায় না নেওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। আমরা এখান থেকে বিশ্রাম নেব না।”
‘জুলাই শহীদদের ঋণ শোধ করতে হবে’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “যাঁদের আত্মত্যাগের কারণে আজকের সংসদ, আজকের সরকার ও আজকের বিরোধী দল—তাঁদের অবহেলা করবেন না। জুলাইয়ের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে শিখুন। শহীদদের আত্মা যদি অভিশাপ দেয়, কেউ শান্তিতে থাকতে পারবে না।”
শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে মন্তব্য
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, “জুলাই ছিল ঘূর্ণিঝড়ের মতো, যে ঘূর্ণিঝড় ফ্যাসিবাদকে তছনছ করে দিয়েছে। বাংলাদেশেও থাকতে দেয়নি। এখন তারা বাইরে বসে মাঝে মাঝে বলে—এই চলে আসলাম।”
তিনি আরও বলেন, “আমার হিসাবে ১৩ বারের ক্যালেন্ডার ব্যর্থ হয়েছে। এখন ১৪ নম্বরবার আগামী ডিসেম্বর। এ দেশের যুবসমাজ প্রস্তুত আছে।”
‘সব জায়গায় চোরের মেলা’
দেশের বিভিন্ন সংকটের কারণ হিসেবে দুর্নীতি ও অনিয়মকে দায়ী করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সব জায়গায় যদি চোরের মেলা বসে থাকে, তাহলে সংকটের সমাধান হবে কীভাবে? ঘাটে ঘাটে চোর বসে আছে। এ কারণেই সংকট দিন দিন বাড়ছে।”
তিনি বলেন, প্রশাসন ও বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হচ্ছে।
গ্যাস-সংকট ও অবৈধ সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন
দেশের গ্যাস-সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈধভাবে সংযোগ নেওয়া অনেক গ্রাহক গ্যাস পাচ্ছেন না, অথচ অবৈধ সংযোগে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
তাঁর ভাষায়, “যে বৈধভাবে লাইন নিয়েছে, সে গ্যাস পায় না। আবার যে চুরি করে লাইন নিয়েছে, সে গ্যাস পায়। এটা কীভাবে সম্ভব? এই চোরদের পেছনে গডফাদার আছে বলেই তারা এসব করতে পারছে।”
তিনি বলেন, সবাই যেন বৈধভাবে গ্যাস পায়, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
ফুটপাত ও সড়ক দখল নিয়ে সমালোচনা
রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখল করে হকারদের ব্যবসা পরিচালনার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ফুটপাত পথচারীদের জন্য এবং রাস্তা যানবাহন চলাচলের জন্য। কিন্তু অনেক জায়গায় হকারদের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, “চলাচলের রাস্তা কেন অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে? কে এগুলো দাগ কেটে বিক্রি করেছে?”
তিনি বলেন, এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে জনসাধারণের চলাচল নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
সমাবেশে অন্যদের বক্তব্য
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
এতে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল বাতেন এবং ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)।
সমাবেশে বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।