পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই হবে না; রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ক্ষমতাকাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপান্তর, সংবিধান সংস্কার এবং জাতীয় পুনর্গঠনের কাজও সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি বলেন, “শুধু নির্বাচন নয়, সংবিধান ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারও জরুরি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ১৪তম কেন্দ্রীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নতুন বাংলাদেশের পথ খুলে দিয়েছে’
জোনায়েদ সাকি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান একই ধারাবাহিকতার অংশ। এসব আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগ দেশের মানুষের ভয় ভেঙে দিয়েছে এবং দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পথ তৈরি করেছে।
তাঁর ভাষায়, এখন সেই অর্জনকে টেকসই করতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
‘ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দুর্বল হয়েছে গণতন্ত্র’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারা এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যাতে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
তিনি বলেন, এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে এবং রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পাশাপাশি ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়ে, আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অর্থ পাচার বৃদ্ধি পায় এবং ব্যাপক লুটপাটের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
‘রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ ও অর্থনৈতিক লুটপাট পরস্পর সম্পর্কিত’
জোনায়েদ সাকি বলেন, রাজনৈতিক স্বৈরাচার এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও লুটপাট একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়। তাই অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যও সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।
‘বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে’
ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে নস্যাৎ করতে নতুন কোনো উগ্রবাদী বা বিভাজনমূলক শক্তি যেন সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, অতীতে জাতীয়তাবাদের নামে যেমন বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে, তেমনি বর্তমানে ধর্ম কিংবা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমেও সমাজকে বিভক্ত করার চেষ্টা চলছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, “একদল জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদের নামে বিভাজন করেছে। এখন আবার অনেকে ধর্মের নামে বা পরিচয়বাদী রাজনীতির নামে মানুষকে বিভক্ত করতে চাইছে। এরা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।”
‘৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির ভিত্তিতে এগিয়েছে আন্দোলন’
ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের শরিক জোনায়েদ সাকি বলেন, গণসংহতি আন্দোলনের ১৪ দফা, গণতন্ত্র মঞ্চের ১৪ দফা এবং বিএনপির ২৭ দফা সমন্বয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার, রাষ্ট্র মেরামত ও রাষ্ট্র রূপান্তরের ৩১ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই কর্মসূচির ভিত্তিতেই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এগিয়েছে এবং জাতীয় পুনর্গঠনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
‘ঐকমত্য না হলে জনগণ ভোটে সিদ্ধান্ত নেবে’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্টের পর জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফল হিসেবেই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়নি, সেসব বিষয়ে জনগণই ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এটিই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
তাঁর ভাষায়, “আমাদের লক্ষ্য নৈরাজ্য সৃষ্টি নয়; সংসদের মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো।”
‘বিচার হবে, তবে প্রতিশোধের রাজনীতি নয়’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন জোনায়েদ সাকি।
তবে তিনি বলেন, বিচার প্রতিষ্ঠার নামে প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সঙ্গে ঘৃণা, উগ্রবাদ এবং বিভাজনের রাজনীতি যেন নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়েও ছাত্রসমাজকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে উপস্থিতি
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মশিউর রহমান রিচার্ডের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ।
এতে আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, সাংবাদিক ও আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
বক্তারা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সাংবিধানিক সংস্কার, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং তরুণদের সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।