স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, শুধু সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ওপর নির্ভর করে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর করা সম্ভব নয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যথাযথ ক্ষমতা, দায়িত্ব ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারলে স্থানীয় সরকার কখনোই কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হল মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তৃণমূল জনপ্রতিনিধি, ইউপি চেয়ারম্যান–মেম্বারদের করণীয়’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মেম্বার অ্যাসোসিয়েশন।
‘শক্তিশালী স্থানীয় সরকারই শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি’
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের যেসব দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী, সেসব দেশে স্থানীয় সরকারও অত্যন্ত কার্যকর।
তিনি বলেন, একটি দেশের স্থানীয় সরকার যত বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ও কার্যকর হয়, সেই দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোও তত বেশি শক্তিশালী হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারকে প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলেন, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে স্থানীয় সরকার শুধু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নয়, বিচার, স্বাস্থ্যসেবা এবং নাগরিক সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সফলভাবে পরিচালনা করে। বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকারকে একইভাবে ক্ষমতায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
‘জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা না বাড়ালে উন্নয়ন সম্ভব নয়’
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করতে হলে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে নির্বাচিত চেয়ারম্যান, সদস্য ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনা করলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তে আইনি সংস্কারের ইঙ্গিত
অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই প্রশাসনিকভাবে বরখাস্ত করার প্রচলিত ব্যবস্থার সমালোচনা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত কাউকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে অপসারণ করা উচিত নয়। আগে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। অপরাধ, অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তবেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এমন একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা চলছে, যাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সহজে বরখাস্ত করা না যায়।
তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি, যাতে আইনটি এমনভাবে সংশোধন করা যায় যে, আপনাদের সহজেই বরখাস্ত করা সম্ভব না হয়।”
তিনি আরও বলেন, অতীতে রাজনৈতিক কারণে বিরোধী মতের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। এখনো বিভিন্ন চেয়ারম্যানকে বরখাস্তের জন্য তাঁর কাছে ফাইল আসে। তবে তিনি মনে করেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।
চেয়ারম্যান–মেম্বারদের ভাতা বাড়ানোর আশ্বাস
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের আর্থিক সুবিধার বিষয়েও কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।
তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান ভাতা তাঁদের দায়িত্ব ও কাজের তুলনায় অত্যন্ত কম।
নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি একসময় পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। ফলে তৃণমূল জনপ্রতিনিধিদের বাস্তব সমস্যাগুলো তিনি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন।
তিনি জানান, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ভাতা আরও সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ত্রাণ ও সরকারি বরাদ্দে স্বচ্ছতার আহ্বান
সরকারি বরাদ্দ এবং ত্রাণ বিতরণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সুবিধা যেন কোনোভাবেই অন্যত্র চলে না যায়, সে বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, কয়েকজন ব্যক্তির অনিয়মের কারণে সব জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
উন্নয়ন কর্মসূচিতে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা এবং উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ভূমিকা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব
দেশের সামাজিক সম্প্রীতির প্রসঙ্গ টেনে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতি দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।
তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মাবলম্বী নাগরিকের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
“ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”— এই নীতির ভিত্তিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
অবাধ ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আশ্বাস
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।
তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কেউ অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন না। জনগণের আস্থা ও ভোটের মাধ্যমেই চেয়ারম্যান, সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী সদস্যরা নির্বাচিত হবেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় সংগঠন গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ত্রাণ বরাদ্দে নতুন পরিকল্পনার কথা জানালেন প্রতিমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন বলেন, ত্রাণ কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে বরাদ্দ প্রদানের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা আগে থেকেই সংগ্রহ করে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়ন ও ত্রাণসংক্রান্ত কার্যক্রম নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি মাঠপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ারও আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মেম্বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে আইনগত সংস্কার, আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং জনপ্রতিনিধিদের মর্যাদা বৃদ্ধির দাবি জানান।