সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর সংসদ সদস্য (এমপি) পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে পৃথক চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলটির দাবি, নিজস্ব তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন তাঁর সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের।
স্পিকার ও সিইসিকে জামায়াতের চিঠি
বৃহস্পতিবার স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠানো পৃথক চিঠিতে জামায়াতে ইসলামী জানায়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে দলীয়ভাবে একটি তদন্ত পরিচালনা করা হয়। তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা নৈতিক স্খলনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত স্পিকার ও সিইসিকে জানানো হয়েছে। এখন পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা তাঁদের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব।
ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে তদন্ত
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁকে এক তরুণীর সঙ্গে দেখা যায়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এরপর জামায়াত দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘পর্দা লঙ্ঘনের’ অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাঁর আচরণ দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে আলোচনা শেষে গত বুধবার সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
দল বহিষ্কার করলেই কি এমপি পদ বাতিল হয়?
গাজী নজরুল ইসলাম দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হচ্ছে না।
সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, কোনো সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হবে কি না, সে বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার স্পিকারের। স্পিকার বিষয়টিকে বিতর্কিত বা আইনি ব্যাখ্যার প্রয়োজন মনে করলে তা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠাতে পারেন।
এরপর নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট পক্ষের শুনানি গ্রহণ এবং আইন ও সংবিধান পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে।
সংবিধানে কী বলা আছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ার পর যদি তিনি স্বেচ্ছায় দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে।
তবে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দল যদি তাঁকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না—এ বিষয়ে সংবিধানে সরাসরি কোনো স্পষ্ট বিধান নেই।
এ কারণেই গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে বিষয়টি সাংবিধানিক ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমান মাছউদ বলেছেন, কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে সংসদ সদস্য পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, স্পিকার বা জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হলে আইন ও সংবিধান পর্যালোচনা করে কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
পদত্যাগের বিষয়ে কী বলছে জামায়াত?
গাজী নজরুল ইসলাম নৈতিক কারণে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবেন কি না—এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, দল তাঁকে পদত্যাগ করতে বলবে না।
তাঁদের ভাষ্য, বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলাম আর জামায়াতের সদস্য নন। ফলে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকবেন নাকি পদত্যাগ করবেন, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একজন সংসদ সদস্যকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারকে জানানো হয়েছে। এখন তাঁরা কী ব্যবস্থা নেবেন, সেটি তাঁদের এখতিয়ার। দল হিসেবে জামায়াত তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছে।
উপনির্বাচনের প্রস্তুতিও ভাবনায়
গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শেষ পর্যন্ত শূন্য ঘোষণা করা হলে সাতক্ষীরা-৪ আসনে সম্ভাব্য উপনির্বাচনের জন্য বিকল্প প্রার্থী নির্ধারণের প্রস্তুতি নেবে জামায়াতে ইসলামী।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট আসনের রুকন, মহিলা বিভাগ, যুব বিভাগ এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত নেওয়া হবে। পরে তিন সদস্যের একটি প্যানেল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হবে এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সেখান থেকে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করবে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বর্তমানে বিষয়টি স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে নাকি শূন্য ঘোষণা করা হবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান আলোচ্য বিষয়।