ঢাকা

শ্রাবণের সুরেলা সন্ধ্যায় মুগ্ধ করলেন রুনা লায়লা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং


বর্ষার আবহ, মৃদু বৃষ্টি আর সুরের মায়ায় ভরা এক স্মরণীয় সন্ধ্যার সাক্ষী থাকল রাজধানী। শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একক সংগীতানুষ্ঠানে কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা তাঁর কালজয়ী গান দিয়ে মাতিয়ে তোলেন দর্শকদের।

দর্শকে পূর্ণ মিলনায়তন

অনুষ্ঠান ঘিরে আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রায় ৭০০ আসনের মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। তরুণ থেকে প্রবীণ—সব বয়সী শ্রোতার উপস্থিতিতে জমে ওঠে আয়োজন। আয়োজকদের মতে, টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সব আসনের টিকিট বিক্রি হয়ে যায়।

দেশাত্মবোধক গান দিয়ে সূচনা

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর মঞ্চে উঠে রুনা লায়লা প্রথমেই ভাষা ও দেশের জন্য আত্মত্যাগীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর দেশাত্মবোধক গান দিয়ে শুরু হয় তাঁর পরিবেশনা।

এরপর একে একে তিনি পরিবেশন করেন ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’, ‘সাধের লাউ’সহ জনপ্রিয় কয়েকটি গান। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো এই মঞ্চে নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারি না’ পরিবেশন করেন তিনি।

দর্শকদের অনুরোধে অনুষ্ঠান শেষ করেন তাঁর বহুল জনপ্রিয় গান ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ দিয়ে। প্রায় দেড় ঘণ্টার পরিবেশনায় মোট ১১টি গান শোনান এই কিংবদন্তি শিল্পী।

গান আর স্মৃতিচারণে প্রাণবন্ত আয়োজন

শুধু গান নয়, পরিবেশনার ফাঁকে নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও মজার ঘটনা শেয়ার করেন রুনা লায়লা। তাঁর প্রাণবন্ত কথাবার্তা ও দর্শকদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ পুরো অনুষ্ঠানকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।

‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ শিরোনামের এই আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মঞ্চে তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক কনসার্ট। এ প্রসঙ্গে হাস্যরসের সঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর হলেও অবশেষে এই মঞ্চে একক আয়োজনের সুযোগ পেলেন।

প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার গল্প

অনুষ্ঠানে রুনা লায়লা তাঁর জীবনের প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার স্মৃতিও তুলে ধরেন। জানান, মাত্র ছয় বছর বয়সে করাচিতে একটি অনুষ্ঠানে বড় বোনের পরিবর্তে হঠাৎ করেই তাঁকে মঞ্চে উঠতে হয়েছিল। সেই আকস্মিক পরিবেশনাই পরবর্তীতে তাঁর সংগীতজীবনের পথচলার সূচনা হয়ে ওঠে।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করা রুনা লায়লা আজও সমান জনপ্রিয়। বাংলা ছাড়াও হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি ও আরও বহু ভাষায় গান গেয়ে তিনি উপমহাদেশের অন্যতম কিংবদন্তি শিল্পীতে পরিণত হয়েছেন।

দর্শকদের উচ্ছ্বাস

অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের অনেকেই রুনা লায়লার প্রাণশক্তি ও কণ্ঠের প্রশংসা করেন। তাঁদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে একই মানের পরিবেশনা ধরে রাখা সত্যিই বিরল। দেশের বরেণ্য শিল্পীদের নিয়ে এমন টিকিটভিত্তিক আয়োজন আরও নিয়মিত হওয়া উচিত বলেও মত দেন অনেকে।

বিশেষ সম্মাননা প্রদান

অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে রুনা লায়লাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। এ সময় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক উপস্থিত ছিলেন।

সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, রুনা লায়লার অসামান্য সংগীতসাধনা বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে।

মানবিক উদ্যোগও ছিল আয়োজনের অংশ

আয়োজকরা জানান, অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রদান করা হবে। ফলে সংগীতের এই সন্ধ্যা শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মানবিক সহায়তার বার্তাও বহন করেছে।

বর্ষার স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় রুনা লায়লার কণ্ঠে একের পর এক কালজয়ী গান যেন দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্মৃতিময় সময়ে। করতালি, আবেগ আর ভালোবাসায় ভরা এই আয়োজন হয়ে থাকে বাংলা সংগীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের আরেকটি স্মরণীয় সংযোজন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স