ঢাকা

জামায়াতের উপদেষ্টা পরিষদে থাকতে পারেন বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনেরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

দলের নীতিনির্ধারণে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করার পরিকল্পনা, গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে আলোচনা চলছে

সরাসরি সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, তবে বিভিন্নভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকেন—এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে প্রস্তাবিত এই পরিষদের মূল কাজ। সাবেক আমলা, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, কূটনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এতে যুক্ত করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। এমনকি অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্য থেকেও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রাখার একটি প্রস্তাব রয়েছে।

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা আরও গতি পায়। গত জুনে দলের সর্বশেষ মজলিশে শুরার বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় আসে। সেখানে প্রস্তাবিত পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা, প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য কার্যক্রম নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, উপদেষ্টা পরিষদের কাঠামো, সদস্য নির্বাচনপ্রক্রিয়া, দায়িত্ব ও সাংগঠনিক অবস্থান নির্ধারণের আগে আরও আলোচনা করতে চায় জামায়াত। এ জন্য কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও মজলিশে শুরার পরবর্তী বৈঠকগুলোতে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে প্রস্তাবিত পরিষদকে কীভাবে দলীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে এবং এর পরামর্শ নীতিনির্ধারণে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী শুরার বৈঠকে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।’

শুরার বৈঠকে উঠবে কি না, সিদ্ধান্ত নেবেন আমির

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পরবর্তী মজলিশে শুরার বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব আলোচ্যসূচিতে রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের। তিনি বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে রাখলে শুরার সদস্যরা এ নিয়ে মতামত দিতে পারবেন। এরপর তাঁদের মতামত ও আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে জামায়াতের গঠনতন্ত্রে এ পরিষদের বিষয়ে আলাদা ধারা বা উপধারা যুক্ত করা হতে পারে। এর মাধ্যমে উপদেষ্টা পরিষদের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে গঠনতন্ত্রের মুদ্রিত সংস্করণেও সংশ্লিষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসব বিষয় এখনো আলোচনাপর্যায়ে রয়েছে। পরিষদ গঠনের অনুমোদন পাওয়া গেলে এর সদস্যসংখ্যা, সদস্য বাছাইয়ের পদ্ধতি, দায়িত্বের পরিধি এবং দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ধারণ করা হবে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে দলটি তাড়াহুড়া করতে চায় না। এ কারণে বিষয়টি আপাতত অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। পরবর্তী নির্বাহী পরিষদের বৈঠক ও মজলিশে শুরায় পরিষদের সম্ভাব্য কাঠামো এবং সদস্যদের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপর দলের আমির সার্বিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

কেন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ

জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, রুকন বা শপথধারী কর্মী হওয়ার মধ্য দিয়ে দলটির আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হয়। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দায়িত্বশীল পদে আসার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কোনো ব্যক্তি জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করলেও আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থাকতে পারেন।

দলটির কয়েকজন নেতার ভাষ্য, বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দলীয় নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানো সম্ভব। কিন্তু তাঁরা সরাসরি সাংগঠনিক রাজনীতিতে যুক্ত হতে আগ্রহী নন কিংবা প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে দায়িত্ব নিতে চান না। তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের কথা ভাবা হচ্ছে।

বিশেষ করে তুলনামূলক বয়োজ্যেষ্ঠ এবং নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এ পরিষদে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তাঁদের কাজ হবে বিভিন্ন নীতিগত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলকে পরামর্শ দেওয়া। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, তাঁরা সরাসরি দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন না করেও নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ওই নেতা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ এমন ব্যক্তিদের উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে, যাঁরা সাংগঠনিক পদ্ধতির কারণে সরাসরি জামায়াতে যুক্ত হতে পারেন না। তাঁরা সংগঠন পরিচালনা এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারবেন। ভবিষ্যতে জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশ পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে দলটির ওই নেতা মনে করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দলের প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশার মানুষকে এ পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হতে পারে। তবে কারা সদস্য হবেন, কীভাবে তাঁদের নির্বাচন করা হবে এবং তাঁদের পরামর্শ গ্রহণের পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সাবেক আমলা, অর্থনীতিবিদ ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের রাখার প্রস্তাব

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত উপদেষ্টা পরিষদে সাবেক আমলা, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং কূটনৈতিক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ও দলের শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও এ পরিষদে রাখার চিন্তা রয়েছে।

এ ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্য থেকেও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রাখার একটি প্রস্তাব রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে এ প্রস্তাবের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কারা এ ধরনের দায়িত্বে আসতে পারেন, তাঁদের নির্বাচন কীভাবে হবে কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় ও পেশাগত পরিচয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে জামায়াতের আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে থাকা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে দলটির যোগাযোগের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। তবে পরিষদটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে এর দায়িত্বের পরিধি, সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের পরামর্শ কীভাবে বিবেচনা করা হয়, তার ওপর।

গঠনতন্ত্র সংশোধনের উদ্যোগও চলছে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাংগঠনিক কাঠামো আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে গঠনতন্ত্রে বিভিন্ন সংশোধনী আনার প্রক্রিয়াও চলছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। সর্বশেষ মজলিশে শুরার বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পাশাপাশি গঠনতন্ত্রের কিছু ধারা সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক ধারার পরিমার্জনের বিষয় রয়েছে। এসব সংশোধনীর মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রমের বিভিন্ন প্রক্রিয়া আরও সুসংগঠিত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

জামায়াতের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংশোধনীর প্রস্তাবগুলো নির্ধারিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে সংশোধনী কমিটি, এরপর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং সবশেষে মজলিশে শুরার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে অনুমোদন পাওয়ার পর সংশোধিত বিধানগুলো দলীয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে কোন কোন ধারায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব এবং গঠনতন্ত্র সংশোধনের অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে কী ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক থাকবে, সেটিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর স্পষ্ট হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

জামায়াতের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক আলোচনা ও সাংগঠনিক পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। পরবর্তী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও মজলিশে শুরার বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। এরপর পরিষদের কাঠামো, সদস্য নির্বাচন, দায়িত্ব এবং গঠনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দলটির নেতাদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সরাসরি সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন—এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জ্ঞান ও পরামর্শ কাজে লাগানোর ব্যবস্থা তৈরি করা। তবে পরিষদটি কবে গঠিত হবে, এতে কতজন সদস্য থাকবেন এবং তাঁদের পরামর্শ দলীয় নীতিনির্ধারণে কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা এখনো অনির্ধারিত।

ফলে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করছে দলটির পরবর্তী বৈঠকগুলোতে গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং প্রস্তাবিত গঠনতন্ত্র সংশোধনের চূড়ান্ত রূপের ওপর।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স