ঢাকা

ফ্রান্সে সেনা নামানোর প্রস্তুতি, ব্যর্থতা স্বীকার সরকারের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক দাঙ্গা ও লুটপাটের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে বিক্ষোভের ডাক এসেছে। আগামী শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে গত সপ্তাহের সহিংসতা মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের ঘাটতির কথাও স্বীকার করেছেন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, আগামী শনিবার বড় পরিসরে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। গত ১৭ অক্টোবর প্যারিস, মার্সেই ও লিয়নসহ বিভিন্ন শহরে সংঘটিত দাঙ্গা ও লুটপাটের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

সংসদে আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, পুলিশের পাশাপাশি নিরাপত্তা কার্যক্রমে সেনাবাহিনীকেও কাজে লাগানো হবে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন কৌশল নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক সহিংসতার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল বলে যে সমালোচনা উঠেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কারফিউয়ে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বর্তমান পরিস্থিতিকে সহিংসতা ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যে বেছে নেওয়ার লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অস্থিরতার জন্য তিনি উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেন। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান কমে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, সরকার তা যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।

সহিংসতার ব্যাপকতা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী প্রার্থীদের ভালো অবস্থান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় এনেছে।

সহিংসতাপ্রবণ কয়েকটি এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারি করার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিছু এলাকায় ১৮ বছরের কম বয়সীদের চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পুলিশের ঘোষণা অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এসব বিধিনিষেধ বহাল রাখার কথা ছিল।

নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে ঘাটতির কথা স্বীকার

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু স্বীকার করেছেন, গত সপ্তাহের সহিংসতা মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া আগে থেকে নির্ধারিত পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল না করাও ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজও ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে নিজের দায়িত্বের অংশ স্বীকার করেছেন।

সহিংসতার প্রকৃত কারণ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে সংসদে তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দাঙ্গা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রায় ২০০ জন তদন্তকারী নিয়োগ করেছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে একটি ঐতিহাসিক পৌর ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দাঙ্গার সময় আগুনে ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তি আগে থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন এবং একটি উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

প্যারিসের রেনেসাঁ পার্টির সংসদ সদস্য সিলভাঁ মায়ার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, কিছু অ্যাপ দাঙ্গাকারী ও লুটেরাদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সহিংসতার প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে

ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতা অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। মঙ্গলবার দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশটির বড় সুপারমার্কেট প্রতিষ্ঠান ক্যারেফুর জানিয়েছে, চুরি ও ভাঙচুরের কারণে তাদের কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চলমান পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছে। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও চাপে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শনিবার নতুন বিক্ষোভের প্রস্তুতি

ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউনেফ আগামী শনিবার আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থার মান কমছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব রয়েছে। এসব দাবিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা জানিয়েছে, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে।

অন্যদিকে, ‘হলুদ জ্যাকেট’ নামে পরিচিত কয়েকটি গোষ্ঠী জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে নতুন কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছে। ২০১৮ সালে জ্বালানির ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনার বিরোধিতা থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। সে সময় কয়েক মাস ধরে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ চলে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বিভিন্ন আর্থিক ছাড় দিতে হয়।

নতুন করে ছাত্র আন্দোলন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিবিরোধী বিক্ষোভ এবং সাম্প্রতিক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে শনিবারের কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ফরাসি প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি সরকারের সামনে এখন জনঅসন্তোষের কারণ মোকাবিলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : Desk

কমেন্ট বক্স