ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈরিতা বা শত্রুতা বাংলাদেশের প্রত্যাশা নয়, তবে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অধিকার যথাযথভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন নদীর সংখ্যা অনেক। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী এসব নদীর পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার কথা থাকলেও গত পাঁচ দশকে সেই অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি।
বুধবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর পলাশী মোড়ে আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভের সামনে আয়োজিত এক স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন। ২০১৯ সালে বুয়েটে ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) নেতাকর্মীদের নির্যাতনে নিহত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘আবরার ফাহাদ স্মৃতি সংসদ’ এ সভার আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো ধরনের শত্রুতার নীতি চায় না। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অর্থ একতরফাভাবে কোনো পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা নয়। পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতেই প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া উচিত।
গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করার দাবি
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে তুলে ধরার এখনই সময়।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার এবং বাংলাদেশকে প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চাওয়ার কথা বলে আসছে। এখন গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে নতুন চুক্তি কীভাবে করা হয়, তার মধ্য দিয়ে সেই অবস্থানের বাস্তব প্রমাণ দিতে হবে।
নাহিদের মতে, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি শুধু আগের চুক্তি নবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং বাংলাদেশের স্বার্থ ও নদী ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে চুক্তি করতে হবে।
তিনি বলেন, বিষয়টি কেবল পানির হিস্যা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অভিন্ন নদীগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনা এবং নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি।
গ্যারান্টি ক্লজসহ নতুন চুক্তির দাবি
গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য একটি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ রাখার দাবি জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, নদীতে সারা বছর ন্যূনতম নাব্যতা ও প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি দেখা দিলে তার প্রভাব যেন একতরফাভাবে বাংলাদেশের ওপর না পড়ে, সে বিষয়েও চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি হলে বাংলাদেশ ও ভারতকে তা সমভাবে বিবেচনা করতে হবে। গঙ্গার পানিবণ্টনের নতুন ব্যবস্থায় এ ধরনের নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তাসহ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন সব নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাধানের দাবি জানান তিনি।
‘শুধু বোয়িং কিনলেই চলবে না’
সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, শুধু বোয়িং বিমান কেনা বা দৃশ্যমান কোনো অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিলেই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয় না। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের জন্য কী অর্জন করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এমন স্লোগান দিলেও বাস্তবে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিসহ বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের করা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো জাতীয় সংসদে আলোচনা করার দাবিও জানান তিনি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়ে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এসব চুক্তি সংসদে আলোচনা করা হলে দেশের মানুষও জানতে পারবে, কোন চুক্তিতে বাংলাদেশের কী স্বার্থ রয়েছে এবং কী ধরনের সুবিধা বা সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করেই কোনো চুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আবরার হত্যার রায় কার্যকরের দাবি
স্মরণসভায় আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আবরার তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেননি। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে সমালোচনা করেছিলেন।
নাহিদ ইসলামের দাবি, ফেনী নদীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের করা বা প্রস্তাবিত একটি চুক্তি নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন আবরার। এ কারণে তাঁকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
তিনি বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি নির্দিষ্ট চিত্র স্পষ্ট হয়েছিল।
তবে এসব বক্তব্য নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরে তিনি আবরার হত্যার বিচারপ্রক্রিয়ার সব আইনি ধাপ শেষ করে রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দ্রুত কার্যকর দেখতে চান তাঁরা। তাঁর মতে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারলে আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্কের আহ্বান
নাহিদ ইসলাম বলেন, আবরার ফাহাদের চেতনাকে ধারণ করতে হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে।
ভারত যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সুসম্পর্ক চায়, তাহলে গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টনে ন্যায্য সমাধান নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি নদী ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের অংশীদারত্ব এবং বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
স্মরণসভায় বক্তারা আবরার ফাহাদের জীবন ও তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে তরুণ প্রজন্মকে আরও সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
আবরার ফাহাদ স্মৃতি সংসদের আহ্বায়ক, এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহউদ্দিন সিফাত সঞ্চালনা করেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও মাহফুজ আলম, এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির সাবেক সভাপতি জাহিদ আহসানসহ অন্যরা।
আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকীর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বক্তারা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আরও কার্যকর রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।