পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (ইএসজি) মানদণ্ড নারীদের জন্য কর্মজীবন ও ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। তবে যথাযথ পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে ইএসজি মানদণ্ড পূরণ করতে গিয়ে নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ও অসম চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের (এসওবিই) উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে ইএসজি ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি এ খাতে নারীদের জন্য তৈরি হওয়া নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ইউআইইউতে নেক্সাস সেমিনার সিরিজের তৃতীয় সেমিনার হিসেবে ‘নারী পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ইএসজি ও জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা’ শীর্ষক এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
ইএসজি থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ
সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সিনিয়র এনভায়রনমেন্টাল স্পেশালিস্ট আফিফা রাইহানা।
তিনি বলেন, ইএসজি ও জলবায়ু-সম্পর্কিত বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা এখন আর শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবসায়িক কৌশল প্রণয়ন, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্থিতিস্থাপকতার ওপর এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
তাঁর মতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরিচালন কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী, ভোক্তা ও বিভিন্ন অংশীজনের কাছে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ পরিবর্তনের ফলে নারীদের জন্য নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইএসজি রিপোর্টিং, টেকসই অর্থায়ন, পরিবেশগত পরামর্শ এবং জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নের মতো ক্ষেত্রগুলোয় নারীরা ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু একাডেমিক ডিগ্রি যথেষ্ট নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। কারিগরি জ্ঞানের পাশাপাশি কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা, অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একাডেমিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব দক্ষতার সমন্বয়ের তাগিদ
মূল বক্তব্যের পর স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও শিক্ষা খাতের তিনজন বিশিষ্ট পেশাজীবীর অংশগ্রহণে প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ, টেকসই ব্যবসায়িক চর্চা, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি চক্রবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের টেকসই অনুশীলনের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বাস্তব কর্মক্ষেত্র ও ব্যবসায়িক পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গেও তাঁদের পরিচিত করে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও মানসিক প্রস্তুতি অর্জন করতে পারবেন।
বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং পরিবর্তিত ব্যবসায়িক বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দেন।
পুরুষপ্রধান নির্মাণশিল্পে নারীদের চ্যালেঞ্জ
প্যানেল আলোচনায় নির্মাণশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। পুরুষপ্রধান নির্মাণশিল্পে নিজের দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে ফ্রান্সভিত্তিক মেনার্ড গ্রুপের বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার ফাহিমা শাহাদাত নারীদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত ও প্রকৌশলভিত্তিক কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে যেমন কিছু পেশাগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তেমনি নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও তাঁদের সামাজিক ও সাংগঠনিক বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
তাঁর অভিজ্ঞতায়, প্রযুক্তিনির্ভর ও ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষপ্রধান খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কর্মক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেই পরিবেশ সচেতনতা গড়ার আহ্বান
শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি আলোচনায় তুলে ধরেন স্যার জন উইলসন স্কুলের প্রিন্সিপাল সাবরিনা শহীদ।
তিনি শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আগেই পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, উদ্যোক্তা মানসিকতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সফল হওয়ার জন্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, সমস্যা সমাধানের মানসিকতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
এ ধরনের প্রস্তুতি ভবিষ্যতে তাঁদের উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে।
একাডেমিয়া ও শিল্প খাতের মধ্যে সেতুবন্ধ
নেক্সাস সেমিনার সিরিজের আহ্বায়ক ও আলোচনার মডারেটর অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, শীর্ষস্থানীয় শিল্প বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের ইউআইইউর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় যুক্ত করার মাধ্যমে একাডেমিক শিক্ষা ও পেশাগত বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের পেশাজীবীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া হলে তাঁরা শিল্প খাতের পরিবর্তনশীল চাহিদা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করতে পারবেন।
নেক্সাস সেমিনার সিরিজের মাধ্যমে এ ধরনের সংযোগ আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
অংশ নেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইউআইইউর বিবিএ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর অধ্যাপক সালমা করিম।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেন।
আলোচনায় ইএসজি, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই ব্যবসা, নারী নেতৃত্ব, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কর্মদক্ষতা তৈরি করাও জরুরি। আর এই পরিবর্তনশীল কর্মবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়ন, নীতিগত সহায়তা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তারা মনে করেন, ইএসজি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলোকে কেবল ব্যবসার জন্য নতুন নিয়ম বা অতিরিক্ত দায় হিসেবে না দেখে নতুন কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই পরিবর্তন নারীদের পেশাগত অগ্রগতি ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।