প্রতিবছর জীবিকার সন্ধানে বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা, নিজের জীবনমান উন্নত করা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখাই তাঁদের বিদেশযাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও তাঁদের অনেকেই প্রত্যাশিত আয়, পেশাগত উন্নতি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এর পেছনে পর্যাপ্ত কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং গন্তব্য দেশের ভাষা সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিদেশে কাজের সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু শারীরিক শ্রম দেওয়ার সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। নিয়োগকর্তার নির্দেশনা বোঝা, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকার জন্য ভাষাগত দক্ষতা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব পেশায় গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হয়, সেখানে স্থানীয় ভাষা জানা কর্মীদের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এ বাস্তবতায় বিদেশগামী কর্মীদের জন্য ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর প্রস্তুতিব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের আয়, নিরাপত্তা ও পেশাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা ও ভাষাগত দক্ষতার গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বিভিন্ন দেশের কর্মীরা নিজেদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নির্মাণ, পরিবহন, বিক্রয়, আতিথেয়তা, রেস্তোরাঁ, সুপারশপ ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ভারত, ফিলিপাইন, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কর্মীরাও এসব খাতে কাজ করছেন।
এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশি কর্মীদের শুধু পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; তাঁদের ভাষাগত ও পেশাগত দক্ষতাও বাড়াতে হবে। কোনো কর্মী যদি গন্তব্য দেশের প্রচলিত ভাষায় প্রয়োজনীয় কথোপকথন করতে পারেন, তাহলে তিনি কাজের নির্দেশনা সহজে বুঝতে পারবেন, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবেন এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে নিজের সমস্যা বা প্রয়োজন তুলে ধরতে পারবেন।
উদাহরণস্বরূপ, আরবিভাষী দেশে কাজ করতে যাওয়া একজন কর্মীর জন্য প্রয়োজনীয় আরবি জানা যেমন উপকারী, তেমনি জাপানে কাজের ক্ষেত্রে জাপানি এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় কোরীয় ভাষার ব্যবহারিক জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিভিন্ন সেবামূলক পেশায় ইংরেজির দক্ষতাও বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
ভাষা জানলেই যে উচ্চ বেতন বা পদোন্নতি নিশ্চিত হবে, তা নয়। তবে ভাষাগত দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কাজের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত যোগ্যতা যুক্ত হলে কর্মীর সামনে তুলনামূলক বেশি সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, ভাষা না জানার কারণে অনেক কর্মী কাজের নির্দেশনা বুঝতে, নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরতে সমস্যায় পড়েন।
তাই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে বিদেশযাত্রার আগে ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ভাষা প্রশিক্ষণে প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি হিসেবে ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হলে সরকারি পর্যায়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা যেতে পারে।
বর্তমানে বিদেশগামী কর্মীদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। গন্তব্য দেশ ও পেশাভেদে প্রশিক্ষণের ধরন নির্ধারণ করা গেলে কর্মীরা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে ছয় মাস, আট মাস কিংবা এক বছর মেয়াদি ভাষা কোর্স চালুর প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সব দেশের জন্য একই মেয়াদ বাধ্যতামূলক না করে গন্তব্য দেশের ভাষা, সংশ্লিষ্ট পেশার ধরন, কর্মীর পূর্ববর্তী শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী প্রশিক্ষণের মেয়াদ নির্ধারণ করা অধিক কার্যকর হতে পারে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শুধু ব্যাকরণ বা লিখিত ভাষা শেখানোর পরিবর্তে ব্যবহারিক কথোপকথনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত সাধারণ শব্দ, নির্দেশনা বোঝা, জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার কথা জানানো এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মতো বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করতে অভিন্ন পাঠ্যক্রম, দক্ষ প্রশিক্ষক, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বীকৃত সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পাশাপাশি অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এ কার্যক্রমে যুক্ত করা সম্ভব। তবে প্রশিক্ষণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া সনদ প্রদান এবং কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা ঠেকাতে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
ভাষা শিক্ষা ও ভিসাপ্রক্রিয়ার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়
বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা যাচাইয়ের বিষয়টি নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সব কর্মীর জন্য একই ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে গন্তব্য দেশের আইন, নিয়োগকর্তার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট পেশার প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
যেসব দেশে নির্দিষ্ট পেশায় কাজের জন্য ভাষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন, সেখানে কর্মীদের আগেভাগে সেই যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। আবার যেসব কাজে প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষার দক্ষতা তুলনামূলক কম প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রেও দৈনন্দিন যোগাযোগ ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে ভাষাগত দক্ষতার সনদ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর আগে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পর্যাপ্ত সক্ষমতা, সাশ্রয়ী খরচ, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং দরিদ্র চাকরিপ্রার্থীদের সহায়তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশিক্ষণের খরচ বহন করতে অক্ষম কর্মীদের জন্য সরকারি ভর্তুকি, স্বল্পমূল্যের কোর্স, সহজ শর্তে ঋণ কিংবা বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ভাষা শিক্ষা যেন বিদেশে যাওয়ার পথে অতিরিক্ত আর্থিক বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
কারিগরি দক্ষতা ও ভাষা শিক্ষার সমন্বয়ে বাড়তে পারে আয়ের সুযোগ
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ভালো কর্মসংস্থান পেতে ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভাষা জানার কারণে কোনো কর্মী দক্ষ পেশাজীবী হয়ে উঠবেন না; এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজের প্রশিক্ষণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের তরুণদের প্লাম্বিং, বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন, ওয়েল্ডিং, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মেরামত, মোটরযান মেরামত, ড্রাইভিং, কেয়ারগিভিং, কম্পিউটার পরিচালনা এবং অন্যান্য চাহিদাসম্পন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এসব প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গন্তব্য দেশের ভাষা শেখানো হলে কর্মীরা বিদেশে গিয়ে কাজের নির্দেশনা বুঝতে এবং নিজেদের দক্ষতা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।
উদাহরণস্বরূপ, একজন প্রশিক্ষিত বৈদ্যুতিক কারিগর যদি স্থানীয় ভাষায় নিরাপত্তানির্দেশনা বুঝতে পারেন, তাহলে তিনি কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একইভাবে, কেয়ারগিভিং পেশায় নিয়োজিত কর্মীর জন্য সেবাগ্রহীতার প্রয়োজন বোঝা, শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন জানানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের দক্ষতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পেশাভিত্তিক ভাষা প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে কর্মীদের জন্য আরও কার্যকর প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হবে। যেমন, নির্মাণশ্রমিকদের জন্য যন্ত্রপাতি, মাপজোক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শব্দ; চালকদের জন্য সড়কচিহ্ন ও নির্দেশনা; আর সেবামূলক পেশার কর্মীদের জন্য গ্রাহকসেবা ও কথোপকথনভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশের নিয়োগকর্তা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মীদের দক্ষতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুধু প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেই হবে না; সেই প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট দেশের চাকরির বাজারে গ্রহণযোগ্য কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও অধিকার রক্ষায় ভাষার ভূমিকা
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য ভাষাগত দক্ষতা শুধু পেশাগত উন্নতির বিষয় নয়; এটি তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ভাষা বুঝতে না পারলে অনেক সময় কর্মীরা কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা, জরুরি সতর্কবার্তা কিংবা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের নিয়ম সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারেন না। এতে দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বিদেশে গিয়ে বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, আবাসন কিংবা চুক্তির শর্ত নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে ভাষাগত দক্ষতা সহায়ক হতে পারে। নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি শ্রম অধিদপ্তর, পুলিশ, হাসপাতাল বা নিজ দেশের দূতাবাসের সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ভাষা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভাষা না জানার কারণে কোনো কর্মী যেন তাঁর আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য বহুভাষিক সহায়তা, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন। ভাষা প্রশিক্ষণকে এসব সুরক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সহায়ক উপায় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিদেশের সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়াও জরুরি। এতে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে এবং অনিচ্ছাকৃত ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি কমতে পারে।
প্রশিক্ষণের সুযোগ পৌঁছাতে হবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে
ভাষা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কার্যকর করতে হলে তা শুধু রাজধানী বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদেরও প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। অনেক চাকরিপ্রার্থী আর্থিক সীমাবদ্ধতা, যাতায়াতের অসুবিধা কিংবা তথ্যের অভাবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেন না।
এ জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সরাসরি ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন ও মিশ্র পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। তবে অনলাইন প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সুবিধা, ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা এবং ব্যবহারিক কথোপকথনের অনুশীলনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিদেশগামী কর্মীদের জন্য একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে বিভিন্ন দেশের চাহিদাসম্পন্ন পেশা, ভাষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সম্ভাব্য খরচ, চাকরির শর্ত এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এতে দালালনির্ভরতা ও ভুল তথ্যের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি কর্মীরা নিজেরাই প্রস্তুতির পরিকল্পনা করতে পারবেন।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। কতজন কর্মী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, কতজন স্বীকৃত সনদ অর্জন করছেন, তাঁদের কতজন বিদেশে কর্মসংস্থান পাচ্ছেন এবং প্রশিক্ষণ তাঁদের কর্মপরিবেশ ও আয়ে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নীতিমালা উন্নত করা যেতে পারে।
কাঁচা শ্রমশক্তি রপ্তানি থেকে দক্ষ জনশক্তি গড়ার পথে
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যার ওপর গুরুত্ব দিলে চলবে না; তাঁদের দক্ষতা, নিরাপত্তা, আয় ও কর্মসংস্থানের স্থায়িত্বও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিদেশে যাওয়ার আগে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পেশাগত সনদ এবং গন্তব্য দেশের আইন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা—এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া, স্বচ্ছ চুক্তি, নিয়োগব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর সহায়তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ভাষাগত দক্ষতা একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তবে এটি কারিগরি জ্ঞানকে কাজে লাগানো, কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ, নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণকে ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে বিদেশে কর্মরত মানুষের জন্য আরও ভালো সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে। এর সুফল ব্যক্তি ও পরিবার ছাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে তাই বিদেশযাত্রার প্রস্তুতিতে ভাষা শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার এখনই সময়।